ভারতের রাজনীতিতে ২০১১ সালের প্রাক্কালে মনমোহন সিং সরকারের পতনের সূত্রপাত ঘটা গণবিক্ষোভের সঙ্গে বর্তমান ২০২৬ সালের দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক গভীর ঐতিহাসিক মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে—রাজধানীর যন্তরমন্তরে দানা বেঁধে ওঠা এই তীব্র গণআন্দোলন এবং জনরোষ কি ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের কোনো নতুন পথ তৈরি করছে? প্রখ্যাত সাংবাদিক সুপ্রিয়া শর্মার একটি বিশেষ নিবন্ধে এই সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এবং পরবর্তীতে রামলীলা ময়দানের বিশাল সমাবেশে রূপ নেওয়া সেই আন্দোলনের মূল অনুঘটক ছিল ‘দুর্নীতি’। আর ঠিক পনেরো বছর পর, ২০২৬ সালের এই সময়ে প্রতিবাদের মূল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কারচুপি’—যার মধ্যে রয়েছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস থেকে শুরু করে নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ও ভোটার তালিকা সংশোধনে বড় ধরনের জালিয়াতি। এই গ্রীষ্মে তরুণদের টানা বিক্ষোভের মুখে খোদ শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। বর্তমানে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন আন্দোলনকারীরা।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, মনমোহন সিং তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দিকে তীব্র সরকারবিরোধী ক্ষোভ বা ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’র মুখে পড়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং বিভাজনের রাজনীতিকে কাজে লাগিয়ে এতদিন সেই জনরোষ আটকে রাখতে পেরেছিলেন। যার ফলে তিনি তৃতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হলেও বর্তমানে সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ তাঁর প্রশাসনিক ভিত্তিকে নাড়া দিচ্ছে। চলতি বছর পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, স্থবির বেতন কাঠামো, ইউপিআই চার্জ বৃদ্ধি এবং ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়মের (এসআইআর ইস্যু) সঙ্গে গ্রামের খরা ও মূল্যস্ফীতি যুক্ত হয়ে মানুষের ক্ষোভ চরম সীমায় পৌঁছেছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী নরেন্দ্র মোদি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালালেও প্রতিবাদের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মুখে তাঁর কৌশল যেন অনেকটাই আড়ালমুখী। গত সপ্তাহে যখন মধ্য দিল্লিতে পুলিশ ও বিরোধী নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম সংঘর্ষ চলছে, তখন প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি পদে ২৫ বছর পূর্তি উদ্যাপন ও ২০৪৭ সালের উন্নত ভারতের স্বপ্ন দেখাতে ব্যস্ত ছিলেন। তবে এবারের বিক্ষোভের তীব্রতা এতটাই প্রবল ছিল যে, সরকারের অনুগত মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও তা এড়িয়ে যেতে পারেনি।
গত এক দশকে ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা, তদন্তকারী সংস্থাসমূহ এবং আর্থিক তহবিলের ওপর ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১১ সালে পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নিলেও, ২০২৬ সালে যন্তরমন্তরের বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতের কার্যকর ভূমিকা না দেখা যাওয়ার বিষয়টিও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে লেখক মনে করেন, সমস্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে কুক্ষিগত করার এই রাজনৈতিক প্রবণতাই শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বাধ্য করেছে সবকিছু উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসতে।
কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত অস্বচ্ছ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সারা দেশের ভোটার তালিকায় বড় ধরনের কারচুপির অভিযোগ এবং তা রোধে বিচার বিভাগের আপাত নিষ্ক্রিয়তাই মূলত বর্তমান সংকটকে তীব্র করেছে। পরিশেষে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের কংগ্রেস জোট সরকারের পতনের পটভূমির সঙ্গে আজকের ভারতের শত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি প্রশ্নই বারবার বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে—২০২৬ সালের এই জনরোষ কি তবে সত্যিই নরেন্দ্র মোদি যুগের অবসান ঘটানোর প্রাথমিক সূচনা?























