জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদের সভাপতি এবং সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায়কে অপর্যাপ্ত ও লঘু বিবেচনা করে তার সাজা বৃদ্ধিপূর্বক মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার আরজি জানিয়ে আপিল বিভাগে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এই রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মাত্রা ও অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই আপিল দায়ের করা হয়, যার সত্যতা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।
এর আগে গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে আনীত সর্বমোট আটটি অভিযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং প্রতিটিতে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। বিচারিক আদালতের রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে, এই তিনটি সাজার মেয়াদ একই সঙ্গে কার্যকর হবে, যার ফলে তাকে সামগ্রিকভাবে ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে। রায়ে উল্লেখ করা হয় যে, রাইসুল ইসলামসহ অন্যান্য ভিকটিমদের শারীরিক নির্যাতন, গুরুতর জখম এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মাধ্যমে নিপীড়ন চালানোর অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা এবং দুষ্কর্মে সহযোগিতার দায়ে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডসহ ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিচার প্রক্রিয়ায় ইনুর বিরুদ্ধে আনীত আটটি অভিযোগের মধ্যে ১, ২, ৪, ৫ এবং ৮ নম্বর অভিযোগ প্রসিকিউশন পক্ষ পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত তাকে সেসব অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি বা খালাস প্রদান করেন। খালাস পাওয়া অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—গত বছরের ১৮ জুলাই একটি ভারতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেওয়া এবং বল প্রয়োগের উসকানি ও হত্যার নির্দেশ প্রদান; ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৪-দলীয় জোটের সভায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা; আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার থেকে বোমা হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগ; গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার এবং গত ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যাসহ দেশজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানির নির্দেশ দেওয়ার মতো গুরুতর সব অপরাধ।
অন্যদিকে, ট্রাইব্যুনালে যে তিনটি অভিযোগে তার সাজা বহাল রাখা হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—ছবি দেখে ছাত্র-জনতার তালিকা তৈরি করে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোনে আটক ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ (৩ নম্বর), ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ (৬ নম্বর) এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি (৭ নম্বর)। বিচারিক রায়ের এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ এখন উচ্চ আদালতে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে আইনি লড়াই আরও তীব্র করেছে।


























