অভিনয়ের প্রতি প্রবল টান থেকেই শোবিজ ভুবনে যাত্রা শুরু করেছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া। অভিনয় জীবন ও পেশাদারিত্বের প্রারম্ভিক সময়ে কাজ করাকেই ক্যারিয়ারের একমাত্র লক্ষ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন ব্যস্ততাকেই সাফল্যের আসল মাপকাঠি বলে মনে করতেন তিনি। তবে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন এই তারকা। বর্তমানে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নিজের পরিবার, বসতঘর এবং ব্যক্তিগত জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছেন। ফলশ্রুত, শুধু মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিকের লোভে নিজের অপছন্দের কোনো কাজের পেছনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে নারাজ তিনি।
১৭ সেপ্টেম্বর (২০২৬) দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজ হ্যান্ডেলে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় অভিনয় জীবনের বর্তমান ভাবনা, ব্যক্তিগত জীবনের মূল্যবোধ, ব্র্যান্ডের প্রচারণামূলক কাজ (প্রমোশনাল কনটেন্ট) এবং পেশাগত কাজের সীমারেখা নিয়ে খোলামেলা মনোভাব ব্যক্ত করেন শবনম ফারিয়া। নিজের পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ফারিয়া লেখেন, একটা লম্বা সময় ধরে তাঁর ধারণা ছিল পুরো জীবনটা হয়তো কেবল অভিনয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে। তবে বহু বছরের নানা চড়াই-উতরাই ও সংগ্রামের পর আলহামদুলিল্লাহ্ তিনি আজ এমন একটি জীবনে পৌঁছাতে পেরেছেন, যার স্বপ্ন তিনি বরাবরই দেখতেন—একটি সুন্দর সংসার, পরিবার ও এমন একটি ঠিকানা, যেখানে দিনশেষে ফিরতে মন চায়। এই পারিবারিক জীবন পাওয়ার পর থেকেই কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্ব তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন।
অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা এখনো অটুট রয়েছে জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, তিনি অভিনয় চালিয়ে যেতে চান। তবে চিত্রনাট্য পছন্দ না হলে কেবল অর্থের বিনিময়ে শুটিংয়ের যানজট পেরিয়ে দৈনিক ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় দিতে তিনি রাজি নন। বরং তাঁকে সত্যি সত্যিই অনুপ্রাণিত করবে—এমন কোনো ব্যতিক্রমী গল্প বা চরিত্রের জন্যই তিনি অপেক্ষায় থাকতে পছন্দ করেন। এই ভাবনারই ধারাবাহিকতায় ব্র্যান্ডের প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরিকে নিজের কাজের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। ফারিয়া জানান, তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিন প্রথম তাঁকে এই পেশাদারি কাজের ধারণা দেন। পরবর্তীতে সরাসরি, এজেন্সির মাধ্যমে এবং পরিচিতজনদের সুবাদে নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাঁর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে।
গত এক বছরে তিনি একাধিক নামিদামি ব্র্যান্ডের প্রমোশনাল কনটেন্টে যুক্ত থেকেছেন। তবে যেকোনো ব্র্যান্ডের প্রস্তাব আসাই মানেই তিনি তা গ্রহণ করেননি; বরং নিজের রুচি, জীবনবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজগুলোই কেবল বাছাই করেছেন।
ভালো পারিশ্রমিক পাওয়ার বিষয়টি প্রমোশনাল কাজের অন্যতম আকর্ষণ বলে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন এই তারকা। তিনি জানান, মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে নিজের সুবিধাজনক সময়ে কাজ করে সম্মানজনক অর্থ উপার্জন সম্ভব হয়, যা তাঁকে পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনকে যথেষ্ট সময় দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। তবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকলেও নিজের বিশ্বাসের পরিপন্থী কোনো পণ্যের প্রচারে তিনি অংশ নেন না। কারণ ব্র্যান্ডের প্রমোশনে তাঁর নাম, চেহারা ও ব্যক্তিগত সুনাম যুক্ত থাকে।
কাজের নির্দিষ্ট নীতি ও সীমারেখার কথা উল্লেখ করে ফারিয়া জানান, তিনি কখনো স্কিন হোয়াইটেনিং বা ফর্সা হওয়ার পণ্য, অ্যাসথেটিক চিকিৎসাসেবা কিংবা ওজন কমানোর স্লিমিং টি, কফি, পানীয় বা ওষুধের প্রচারণায় অংশ নেন না। সৌন্দর্যের সংজ্ঞা নিয়ে নিজের অটল অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, তাঁর গায়ের রং, ফেসকাটিং, নাক, চিবুক কিংবা দৈহিক গড়ন—সবই সৃষ্টিকর্তার দান। তাই সুন্দর হতে হলে ফর্সা হতে হবে বা শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ পরিবর্তন করতে হবে—এমন বিকৃত মানসিকতা ছড়ানোর কাজে তিনি যুক্ত হতে চান না।
ওজন কমানোর পণ্যের বিজ্ঞাপন না করার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, বিগত কয়েক বছর যাবৎ তিনি নিজেও ওজন সংক্রান্ত শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এবং তা কমানোর সংগ্রাম কতটা কঠিন তা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেন।
তবে কোনো তথাকথিত ম্যাজিক ড্রিংক বা স্লিমিং টিতে তিনি বিশ্বাস করেন না। নিজের হরমোনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, শর্টকাট পদ্ধতির বদলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ডায়েটিশিয়ান ও সুষম জীবনযাপনের মাধ্যমেই ফল পাওয়া সম্ভব। তাই নিজে যে শর্টকাট পদ্ধতিতে বিশ্বাস করেন না, স্রেফ অর্থের লোভে তা অন্যকে সাজেস্ট করা অনৈতিক মনে করেন তিনি।
সমাজে প্রচলিত ফর্সা হওয়ার প্রবণতা ও কৃত্রিম সৌন্দর্যের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই অভিনেত্রী বলেন, আজকাল কেবল ফর্সা হওয়াই নয়, বরং নাক, চিবুক বা শরীরের আকার ঠিক কেমন হতে হবে—তার একটি বাণিজ্যিক সংজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের যত্ন নিলে বা পরিবর্তন চাইলে তাতে তাঁর আপত্তি নেই; কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি যথেষ্ট সুন্দর নয়—এমন হীনম্মন্যতা তৈরি করার বাণিজ্যিক প্রচেষ্টাকে তিনি সমর্থন করেন না। সবশেষে ফারিয়া জানান, প্রমোশন করা সব পণ্য শতভাগ নিখুঁত—এমন দাবি তিনি করছেন না; তবে নিজের নীতি মেনে চলার সুযোগ যেহেতু তাঁর আছে, তাই সচেতনভাবেই তিনি কাজের সেই সীমারেখা রক্ষা করে চলবেন।
























