ইয়েমেনের রাষ্ট্রক্ষমতা ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল। দেশটির কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি হুতি বিদ্রোহীদের দখলে থাকা সমস্ত অঞ্চল পুনর্দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশজুড়ে সর্বাত্মক ও পূর্ণমাত্রার সামরিক অপারেশন পরিচালনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। গত রবিবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি দেশের সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সব সামরিক ইউনিটকে হুতিদের মূলোৎপাটন না করা পর্যন্ত অভিযান অবিরাম চালিয়ে যাওয়ার কঠোর নির্দেশ দেন। পাশাপাশি, চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সামরিক মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি জানিয়েছেন, এই বড় ঘোষণা আসার ঠিক আগে গত শনিবার সরকারি বাহিনী হুতিদের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থান ও সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ২৫৭টি সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এসব ঝটিকা হামলায় অন্তত ৭০০ হুতি বিদ্রোহী প্রাণ হারিয়েছেন। এদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন সরকারপন্থী জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিক এক বক্তব্যে অভিযোগ করেছেন যে, হুতিদের সঙ্গে বিভিন্ন বহিরাগত শক্তির অনৈতিক গোপন সম্পর্কের কারণেই পুরো ইয়েমেনজুড়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
চলমান এই সংঘাতের অংশ হিসেবে গত রবিবার ভোরে সৌদি জোট জানিয়েছে যে, তারা তোর আল-বাহা ফ্রন্ট এবং তাইজ অঞ্চলে হুতিদের নতুন করে শক্তি সঞ্চয় ও রসদ সরবরাহের প্রচেষ্টার ওপর ৯৭ বার হামলা চালিয়েছে। এসব অতর্কিত আক্রমণে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ভারী কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও স্নাইপার ব্যবহার করা হয়। এর পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে হুতিদের পক্ষে মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন যে, তাদের বাহিনী সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘সৌদি আরামকো’র দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে সফল হয়েছে। এর মধ্যে একটি রিয়াদে এবং অন্যটি রাজধানী থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে খুরাইস এলাকায় অবস্থিত বলে জানানো হয়। তবে এই দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ।
লন্ডনভিত্তিক বিশিষ্ট প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইব্রাহিম জালাল মনে করেন, হুতিদের দমনে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে এক সম্পূর্ণ নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিগত ছয় বছর ধরে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং বিবদমান পক্ষগুলোর অনমনীয় অবস্থানের কারণে শান্তি ফেরানোর সব কূটনৈতিক উদ্যোগ ভেস্তে গিয়েছিল। এই রাজনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থা ভাঙতে একটি সুনির্দিষ্ট ও বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের বিকল্প ছিল না। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই মূলত ইয়েমেনে এই রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং তৎকালীন সরকার বাধ্য হয়ে এডেনে সরে যায়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ জুলাই মাসে ফুরিয়ে যাওয়ার পর থেকে দুই পক্ষের লড়াই নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে, যার ফলে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হুতিরা লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির দ্বীপগুলো ও মোচা বন্দরনগরী দখলের চেষ্টা করলে সংঘাতের পারদ আরও উঁচুতে উঠে যায়।























