একটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি জনগণ হলেও, এর সংকট কেবল অর্থনীতি, রাজনীতি বা প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর গভীরে রয়েছে জনগণের চৈতন্যবোধের সংকট। বাংলাদেশের সমাজজীবনে মূল্যবোধের অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা এবং নৈতিকতার দুর্বলতা এই গভীর সংকটকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।
সম্প্রতি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি সভাকক্ষে আয়োজিত ‘চৈতন্যের সংকট’ শীর্ষক এক সেমিনারে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং আমার দেশ পাঠকমেলা গণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যরা এই বিষয়টি নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় অংশ নেন। সেমিনারে চৈতন্যবোধের সংকট, বিশ্বায়ন, পুঁজিবাদ এবং নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সমাজ নিরীক্ষণের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমাজজীবনে সামাজিক সমস্যার গভীরতম সংকট বিদ্যমান। এই সামাজিক সমস্যার অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয় যে, সমাজের প্রতিটি স্তরে চৈতন্যের সংকট প্রবহমান। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এই চৈতন্যবোধের সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মানবসভ্যতার বিকাশে চৈতন্যবোধ অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে চৈতন্যবোধ অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চৈতন্যবোধ অর্জনের বিষয়টি মূলত ব্যক্তির আচরণবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। মনোবিজ্ঞানের আচরণবাদী তত্ত্বে জন বি. ওয়াটসন মানুষের অভ্যন্তরীণ চেতনা বা অনুভূতির পরিবর্তে পর্যবেক্ষণযোগ্য বাহ্যিক আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ব্যক্তির চৈতন্যবোধ মূলত তার আচরণের ভেতর দিয়েই প্রকাশিত হয়।
মানুষের চৈতন্যবোধ সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের ‘নিজেকে জানো’ তত্ত্বটি বিশেষভাবে বিশ্লেষণযোগ্য। অ্যারিস্টটল বিশ্বাস করতেন, বাহ্যিক জগৎকে বোঝার আগে নিজের মন ও আত্মাকে জানা জরুরি। তিনি মনে করতেন, ব্যক্তি শুধু নিজের জন্যই জ্ঞান অর্জন করবে না, বরং ব্যক্তির জ্ঞান সমাজকেও আলোকিত করবে।
প্লেটোর সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণাতেও চৈতন্যবোধের গুরুত্ব দেখা যায়। প্লেটোর সামাজিক ন্যায়বিচারের মূলকথা হলো সমাজে যার যা প্রাপ্য তা তাকে প্রদান করা। প্লেটোর এই সামাজিক ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যখন ব্যক্তি বা সামাজিক জনগোষ্ঠী চৈতন্যবোধ অর্জন করবে।
চৈতন্যবোধের ধারণাটিকে জন স্টুয়ার্ট মিল ও জেরেমি বেস্থামের উপযোগবাদের সঙ্গেও সম্পৃক্ত করা যায়। উপযোগবাদের মূলকথা হলো নৈতিক দর্শন, যা ব্যক্তির কর্মফলের ওপর নির্ভর করে।


























