মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধ রয়েছে, যা কেবল জয়-পরাজয়ের সমীকরণ ছাপিয়ে বদলে দেয় সভ্যতার গতিপথ। এমনই এক যুগান্তকারী ও নির্ণায়ক মোড় ঘোরানো যুদ্ধের নাম ‘আইনে জালুত’। হিজরি ৬৫৮ সালের ২৫ রমজান, যা খ্রিষ্টীয় হিসেবে ১২৬০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ছিল, ফিলিস্তিনের আইনে জালুত প্রান্তরে সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল দুটি পরাক্রমশালী বাহিনী। একদিকে মামলুক সুলতান সাইফুদ্দীন কুতুজের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাদল, আর অন্যপক্ষে দুর্ধর্ষ হালাকু খানের নেতৃত্বাধীন মঙ্গোল ও তাতার বাহিনী।
সেদিন এই প্রান্তরে কেবল একটি মামলুক রাষ্ট্রই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়নি, বরং চিরতরে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল অপরাজেয় মঙ্গোলদের দম্ভ। চেঙ্গিস খানের উত্থানের পর এই প্রথম কোনো যুদ্ধে মঙ্গোলরা এমন শোচনীয় পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে। এই অভাবনীয় বিজয়ের সবচেয়ে বড় ফলাফল ছিল—যে মঙ্গোলরা ইরাকে আব্বাসীয় খিলাফতের পতন ঘটিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে আসছিল, তাদের সেই সর্বনাশা আগ্রাসনের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়।
হিজরি সাত (খ্রিষ্টীয় তেরো) শতকে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনীর একের পর এক আগ্রাসনে তখন বিপর্যস্ত ছিল গোটা মুসলিম বিশ্ব। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো একে একে ভেঙে পড়ছিল, ধ্বংস হচ্ছিল নগর, জনপদ ও মুসলিম সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন। পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়া এই আগ্রাসন ঠেকানোর মতো শক্তিশালী প্রতিরোধও যেন অবশিষ্ট ছিল না।
ইরানের ভূখণ্ড তছনছ করার পর মঙ্গোলরা এগিয়ে যায় ইরাকের দিকে। চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খানের বাহিনী বাগদাদ অবরোধ করে। ১২৫৮ সালে শহরের পতনের পর সংঘটিত হয় ব্যাপক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। নিহত হন শেষ আব্বাসী খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহ; ধ্বংস ও লুণ্ঠনের শিকার হয় বাগদাদের বহু স্থাপনা ও জ্ঞানভাণ্ডার। এর মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বাগদাদের পতন ঘটে এবং মঙ্গোলদের পশ্চিমমুখী অগ্রযাত্রার পথ আরও প্রশস্ত হয়।
আইয়ুবি সালতানাতের অধীন শামও তখন মঙ্গোল আক্রমণে বিপর্যস্ত। এমন সংকটময় সময়ে মুসলিমদের প্রয়োজন ছিল ঐক্য; কিন্তু ঘটল উল্টোটা। দামেস্ক ও আলেপ্পোর শাসক নাসির ইউসুফ আইয়ুবি মঙ্গোলদের আনুগত্য স্বীকার করে মিসর দখল ও সদ্য প্রতিষ্ঠিত মামলুক সালতানাত ধ্বংসে তাদের সামরিক সহায়তা কামনা করেন।
অন্যদিকে মিসরের মামলুক রাষ্ট্রও তখন গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটে ভুগছিল। সিংহাসন নিয়ে বিরোধে সুলতান মুইজ ইজজুদ্দীন আইবেক তার প্রতিদ্বন্দ্বী ফারিসকে হত্যা করেছিলেন, যা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু এই চরম সংকটের মুহূর্তে মামলুক সুলতান সাইফুদ্দীন কুতুজ তার দূরদর্শিতা ও রণকৌশল দিয়ে মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে আনেন, যা মুসলিম বিশ্বের টিকে থাকার পথ খুলে দেয়।


























