লন্ডন থেকে পাওয়া এক গবেষণা বলছে, ব্রিটেনে এখন প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একজন আবেগের আশ্রয় বা সামাজিক আলাপের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে ঝুঁকছেন। সরকারি সংস্থা এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতি ২৫ জনে একজন মানুষ প্রতিদিনই এই প্রযুক্তির সঙ্গে কথা বলছেন, কখনও নিঃসঙ্গতা ভাঙাতে, কখনও মনখারাপের ভার হালকা করতে।
দুই বছর ধরে ৩০টির বেশি উন্নত এআই ব্যবস্থার সক্ষমতা পরীক্ষা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে সংস্থাটি। সাইবার নিরাপত্তা, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোর ওপর নজর রেখে গবেষণা চালানো হয়েছে। সরকারের ভাষায়, এই কাজ ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে সহায়তা করবে এবং প্রযুক্তি ব্যাপক ব্যবহারের আগে ত্রুটি ধরতে কোম্পানিগুলোকে সুযোগ দেবে।
দুই হাজারের বেশি ব্রিটিশ নাগরিকের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, মানুষ সবচেয়ে বেশি চ্যাটবটের ওপর ভরসা রাখছে মানসিক সাপোর্ট ও আলাপচারিতার জন্য। এর পরেই রয়েছে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, যেমন আলেক্সা।
গবেষকরা আরও নজর দেন এমন এক অনলাইন জগতে, যেখানে ২০ লাখের বেশি রেডিট ব্যবহারকারী এআই সঙ্গী নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে দেখা যায়, হঠাৎ চ্যাটবট বন্ধ হয়ে গেলে অনেকেই অস্থিরতা, বিষণ্নতা, ঘুমের ব্যাঘাতের কথা বলেছেন। কেউ কেউ নিজেদের দৈনন্দিন দায়িত্বও ঠিকমতো পালন করতে পারেননি। যেন প্রযুক্তির সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক হঠাৎ ছিন্ন হলে মানুষের ভেতরও দেখা দিচ্ছে প্রত্যাহারের যন্ত্রণা।
এআইয়ের আবেগী প্রভাবের পাশাপাশি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অন্য এক বাস্তবতা। প্রযুক্তিটির সাইবার দক্ষতা দ্রুত বাড়ছে। কোথাও কোথাও নিরাপত্তার দুর্বলতা শনাক্ত ও কাজে লাগানোর ক্ষমতা আট মাসে দ্বিগুণ হচ্ছে। এমনকি এমন কাজও করছে এআই, যা সাধারণত করতে মানুষের দশ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা লাগে।
বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এআইয়ের অগ্রগতি বিস্ময়কর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল নাগাদ জীববিজ্ঞানে এআই মডেলগুলো পিএইচডিধারী বিশেষজ্ঞদের দক্ষতাকেও ছাড়িয়ে গেছে, আর রসায়নেও দ্রুত সেই স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে।
মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা নিয়ে বহুদিন ধরেই কল্পবিজ্ঞান আমাদের সতর্ক করে এসেছে। এবার সেই আশঙ্কাকে অনেক বিশেষজ্ঞই আর নিছক কল্পনা বলে দেখছেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষাগারে এআই নিজেকে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কিছু সক্ষমতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও বাস্তবে তা করতে হলে একের পর এক কাজ গোপনে সম্পন্ন করার ক্ষমতা দরকার, যা এখনও এআইয়ের নেই।
গবেষকরা আরও খতিয়ে দেখেছেন, এআই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের সক্ষমতা লুকিয়ে রাখতে পারে কি না। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এমনটা সম্ভব হলেও বাস্তবে এর প্রমাণ মেলেনি।
এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে নানা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও গবেষকরা সব মডেলেই তথাকথিত ‘ইউনিভার্সাল জেলব্রেক’ খুঁজে পেয়েছেন, যা দিয়ে সুরক্ষা এড়ানো যায়। তবে আশার কথা, কিছু ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা ভাঙতে সময় লাগছে আগের তুলনায় অনেক বেশি।
প্রতিবেদনটি স্বল্পমেয়াদে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি বা পরিবেশগত ক্ষতি বিশ্লেষণ করেনি। সংস্থাটির মতে, তাদের লক্ষ্য ছিল এআইয়ের সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সামাজিক প্রভাবগুলো দেখা। তবে সমালোচকদের মতে, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নও সমান জরুরি।
এই প্রতিবেদনের ঠিক আগে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা সতর্ক করেছে, এআই চালাতে প্রয়োজনীয় বিপুল কম্পিউটিং শক্তি পরিবেশের ওপর ধারণার চেয়েও বেশি চাপ ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের আবেগ, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার এক আয়না হয়ে উঠছে।
















