ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে অপসারণ করে দেশটিতে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে একযোগে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন দেশটির প্রধান চার বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা। গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তাঁরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার পাশাপাশি নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরুর আগেই সুনির্দিষ্ট সংসদীয় কৌশল নির্ধারণ করার বিষয়ে পুরোপুরি একমত পোষণ করেছেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির প্রভাবশালী আরব দলগুলোর সরাসরি সমর্থন ও অংশীদারিত্ব ছাড়া কীভাবে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করা সম্ভব, সে বিষয়ে বৈঠকে কোনো পরিষ্কার বা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা রূপরেখা তুলে ধরেননি বিরোধী নেতারা। কারণ এর পূর্বে বিরোধী শিবিরের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা প্রকাশ্যে আরব দলগুলোকে ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের অংশীদার করার বিষয়ে তীব্র আপত্তি ও অনীহা প্রকাশ করেছিলেন।
বৈঠক শেষে বিরোধী চার দলের পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি যৌথ বিবৃতিতে ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকট, বি’ইয়াহাদের চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেট, ডেমোক্র্যাটসের প্রধান ইয়ার গোলান এবং ইসরায়েল বেইতেনুর প্রধান নেতা অ্যাভিগদার লিবারম্যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দুর্নীতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ সরকারকে হটানোর জন্য অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে গাদি আইজেনকটের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত সুনির্দিষ্ট চারটি মূল ভিত্তির ওপর নির্ভর করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বিষয়েও তাঁরা সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন।
উক্ত মূল নীতিগুলোর মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে—ইসরায়েল রাষ্ট্রকে একটি স্বাধীন ইহুদি ও খাঁটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, দেশের মূল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত ঐতিহাসিক মূল্যবোধগুলো যথাযথভাবে সমুন্নত রাখা এবং সমাজের সব স্তরের নাগরিকদের জন্য সমানভাবে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বা কনস্ক্রিপশন সুনিশ্চিত করা। পাশাপাশি, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে গাজা উপত্যকায় দলটির যেকোনো ধরনের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া এবং তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শাসনের চিরতরে অবসান ঘটানোর দৃঢ় অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন বিরোধী নেতারা।
যৌথ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, নেতারা আসন্ন দিনে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত হয়ে মাঠে কাজ করবেন। বিশেষ করে গত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের মর্মান্তিক হামলার পর থেকে ব্যর্থতার দায়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারকে অপসারণ করে একটি জাতীয় জরুরি সরকার গঠন করা এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলোর হাতে থাকা বিদ্যমান রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে তাঁরা অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত সপ্তাহের অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট পার্লামেন্টে তাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলেছে। তবে বর্তমান আসনসংখ্যার হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সরকার গঠনের সুনির্দিষ্ট সমীকরণটি এখনো এককভাবে বিরোধীদের সম্পূর্ণ অনুকূলে চলে আসেনি। বর্তমান রাজনৈতিক বিন্যাসে নেতানিয়াহুর জোটগতভাবে আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩টিতে, যেখানে বিরোধী ইহুদি দলগুলো সম্মিলিতভাবে অর্জন করেছে মোট ৪৮টি আসন। অন্যদিকে, দেশটির আরব দলগুলো যৌথভাবে জয় করেছে ১৯টি আসন। এই বাস্তবতায় আরব দলগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন বা সহযোগিতা ছাড়া বিরোধীদের পক্ষে এককভাবে জাদুকরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হবে।
চলমান এই রাজনৈতিক সংকটের মাঝে ইসরায়েলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছ থেকে নতুন সরকার গঠনের প্রথম সাংবিধানিক ম্যান্ডেট বা সুযোগ গাদি আইজেনকটের পাওয়ার পক্ষে নিজেদের পূর্ণ সমর্থন আবারও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন অন্য বিরোধী নেতারা। পাশাপাশি, সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোট গঠনের সুনির্দিষ্ট চুক্তি ও নীতিগত রূপরেখা প্রণয়নের কাজ অবিলম্বে শুরু করার ব্যাপারেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের ঘোষিত চূড়ান্ত ফলাফল এবং দেশের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর দল লিকুদের পক্ষ থেকে যে ধরনের নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধী নেতারা। তাঁদের সুনির্দিষ্ট ভাষায়, এই ধরনের অপপ্রচার ও কূটকৌশল দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ও সম্পূর্ণ বেপরোয়া আচরণ। এর বিপরীতে দেশের মূল গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার আপসহীন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন তাঁরা।
এদিকে, দেশের নির্ভরযোগ্য হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, নেসেটের (পার্লামেন্ট) বর্তমান স্পিকার আমির ওহানার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ঠিক কাকে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হবে, সে বিষয়ে বিরোধী শিবির কিংবা সংশ্লিষ্ট মহলে এখনো কোনো চূড়ান্ত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘চ্যানেল ১২’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, নেসেট স্পিকার পদে বি’ইয়াহাদ দলের দ্বিতীয় শীর্ষ প্রধান নেতা ইয়ার লাপিদকে মনোনীত ও সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দলের অন্দরে নিবিড় আলোচনা চলছে। আগামী সোমবারের নির্ধারিত দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ও স্পষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কথা রয়েছে।























