দীর্ঘ প্রায় এক যুগ বা ১১ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নতুন প্রবর্তিত জাতীয় বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল অনুযায়ী অক্টোবর মাসের মূল বেতন এবং গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া অর্থ হাতে পেতে শুরু করেছেন দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল ১০টার পর থেকে দেশের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত অসংখ্য সরকারি কর্মচারী তাঁদের মোবাইল ফোনে অক্টোবরের মূল বেতন এবং বিগত তিন মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার দাপ্তরিক এসএমএস নোটিফিকেশন পেতে শুরু করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ৮ লাখ নিবন্ধিত পেনশনভোগী এবং প্রায় ৬ লাখ এমপিওভুক্ত (MPO) শিক্ষকসহ বিশাল এই জনগোষ্ঠীর প্রায় সবাই ইতোমধ্যে এই নতুন পে-স্কেলের বর্ধিত বেতন ও ভাতাদি বুঝে পেয়েছেন।
তবে যেসকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাপ্তরিক ‘পে-ফিক্সেশন’ বা বেতন নির্ধারণের জটিল প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি, কেবল তাঁরাই এই মুহূর্তে নতুন কাঠামোর সংশোধিত বেতনটি পাননি। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, গত রবিবার সকাল থেকেই তাঁরা নতুন পে-স্কেলের অধীন প্রাপ্ত বেতনের নিশ্চিতকরণের মেসেজ পান। তাঁরা দৃঢ় আশা প্রকাশ করে বলেন, পেমেন্ট বা পে-ফিক্সেশন সংক্রান্ত বাকি দাপ্তরিক কাজগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই বাকি কর্মচারীরাও তাঁদের নির্ধারিত বকেয়াসহ পাওনা টাকাগুলো পেয়ে যাবেন।
উল্লেখ্য, বিগত গত ১৭ সেপ্টেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে নতুন ‘জাতীয় বেতন স্কেল’-এর বহুল প্রতীক্ষিত গেজেট প্রজ্ঞাপন আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হয়েছিল। ওই প্রজ্ঞাপনে সরকারি চাকুরিজীবীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেডের কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সংশোধিত নতুন আর্থিক কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম থেকে একাদশ (১ থেকে ১১) গ্রেডের মধ্যকার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মূল বেতন এক লাফে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দ্বাদশ থেকে বিংশ (১২ থেকে ২০) গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই বেতন বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন ১১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই নতুন বেতন কাঠামোটি মূলত ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর হিসেবে ধরা হলেও, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তা একক ধাপে সম্পূর্ণ পরিশোধ না করে ধাপে ধাপে বা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
নতুন প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম থেকে নবম (৯ বা তদূর্ধ্ব) গ্রেডের উধ্বর্তন কর্মকর্তারা বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং দশম থেকে বিংশ (১০ থেকে ২০) গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে আর্থিক সুবিধা ভোগ করবেন। ২০২৬ সালের ৩০ জুনে উত্তোলিত বা প্রদেয় মূল বেতনের ভিত্তিতেই এই অতিরিক্ত অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে হিসাব করা হয়েছে।
এরপর পরবর্তী ধাপে আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সকল কর্মচারী বর্ধিত মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ হারে অর্থ পাবেন। পরবর্তীতে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধিসহ সংশোধিত স্কেলের শতভাগ বা পুরো টাকাই সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে সরকার।
তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্যান্য সকল ভাতা বা সুযোগ-সুবিধা ২০১৬ সালের ৩০ জুনে প্রযোজ্য হারেই বলবৎ ও অব্যাহত থাকবে। প্রজ্ঞাপনে বিশেষভাবে ঘোষিত ভাতাগুলোর নতুন ও সংশোধিত হার পরবর্তীতে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
এর আগে দেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। ফলে দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর দেশের সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষক সমাজের বেতনে এটিই হলো সবচেয়ে বড় ধরনের কাঠামোগত পুনর্গঠন ও বেতন বৃদ্ধি। এর আগে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডে ১০১ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৯৫ শতাংশ মূল বেতন বৃদ্ধি পেয়েছিল।






















