মধ্যরাতের ঘুটঘুট অন্ধকারে হুট করে ঘরবাড়ি ছাড়ার চরম কড়া নির্দেশ, চতুর্দিকে সাঁড়াশি সামরিক অবরোধ এবং শহর থেকে বাইরে পালানোর সবকটি পথও সম্পূর্ণ বন্ধ। হুট করে নেমে আসা এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত দিশাহারা ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অধিকৃত পশ্চিম তীরের ঐতিহ্যবাহী হেবরন শহরের ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা।
নিজেদের ও পরিবারের প্রাণের সুরক্ষায় একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন অগণিত পরিবার। ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর অব্যাহত নির্মম অভিযান ও সর্বাত্মক অবরোধের মুখে পড়ে এ পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ২০০ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক সম্পূর্ণ গৃহহীন ও ঘরছাড়া হয়ে পড়েছেন।
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’-র এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানা যায়, অধিকৃত পশ্চিম তীরের কমপক্ষে ১৫টি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে একযোগে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব তাণ্ডব ও সাঁড়াশি অভিযানে অন্তত ৭০ জন সাধারণ ফিলিস্তিনিকে অন্যায়ভাবে আটক করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, হেবরন শহরের সম্মানিত মেয়র ইউসুফ আল জাবারি সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, ইসরায়েলি বাহিনীর বহুমাত্রিক আক্রমণ ও সার্বিক অবরোধের প্রত্যক্ষ শিকার হয়ে শহরের প্রায় ২ হাজার ২০০ জন স্থায়ী বাসিন্দা ঘরবাড়ি হারিয়ে মারাত্মক বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন।
ভুক্তভোগী স্থানীয় ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের তীব্র অভিযোগ, গভীর রাতের অন্ধকারে লাউডস্পিকারে মাইকিং করে তাঁদের অবিলম্বে বাড়িঘর খালি করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়। ফলে পরিধেয় বস্ত্র ছাড়া কোনো জরুরি প্রস্তুতি বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নেওয়ার ন্যূনতম সুযোগও তাঁরা পাননি।
এর পাশাপাশি, পুরো হেবরন শহরে প্রবেশের মূল সড়ক ও বাইরে বের হওয়ার সমস্ত সংযোগ পথ সামরিকভাবে সিলগালা ও বন্ধ করে দেওয়ায় ঘরছাড়া এই অসহায় অধিবাসীদের জন্য নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে গিয়ে মাথা গোঁজাও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিদের চরম মানবিক দুর্ভোগ, হাহাকার ও মানসিক আতঙ্ক বহু গুণে বেড়ে গেছে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার হেবরনের পাশেই অবস্থিত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ রিজার্ভ ঘাঁটিতে দুই স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর আকস্মিক হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হন।
পরবর্তীতে ইসরায়েলি বাহিনীর পাল্টা গুলিতে ওই দুই ফিলিস্তিনিও ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান। এই হামলার পরপরই পুরো অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর অবরোধ জারির নির্দেশ দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
এই নির্দেশের পর পরই হেবরনে বিশাল সাজোঁয়া যান ও ভারী বুলডোজার নিয়ে সুপরিকল্পিত হামলা চালিয়ে অসংখ্য ফিলিস্তিনির বসতবাড়ি ও ব্যক্তিগত যানবাহন পুরোপুরি গুঁড়িয়ে ছাতু করে দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। একই সঙ্গে পুরো শহরের মোড়ে মোড়ে কাঁটাতারের বেড়া ও ব্যারিকেড দিয়ে নাগরিকদের দৈনন্দিন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এদিকে, ফিলিস্তিনের স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এই বর্বর অভিযানের চরম নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রশাসনের স্পষ্ট অভিযোগ, আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে জোরপূর্বক ঘরবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া, সাধারণ বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা এবং পুরো শহর অবরুদ্ধ করে রাখা আসলে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর একধরনের জঘন্য সম্মিলিত শাস্তি চাপিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা। এই চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে অনতিবিলম্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তারা।
এছাড়াও, হেবরন শহরের ঠিক উত্তরে হালহুল নামক এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের ছোড়া বিষাক্ত কাঁদানে গ্যাসের তীব্র প্রকোপে গুরুতর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ছয়জন কোমলমতি শিশুসহ মোট নয়জনকে তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা সেবা দিয়েছে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট।
পাশাপাশি, জেনিন শহরে পরিচালিত অপর এক ইসরায়েলি অভিযানে নতুন করে অন্তত দুইজন ফিলিস্তিনি গুলিবিদ্ধ ও মারাত্মক আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ফিলিস্তিনের অফিশিয়াল সংবাদ সংস্থা ‘ওয়াফা’ (WAFA)।
ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, মূল হেবরন শহরে প্রায় ২ লাখ এবং পুরো হেবরন গভর্নরেট জুড়ে আরও প্রায় ৬ লাখ ফিলিস্তিনি অধিবাসী বসবাস করেন। পুরো শহর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সেখানকার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজকর্ম ও বেঁচে থাকার সামগ্রিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্তব্ধ ও ব্যাহত হয়ে পড়েছে।























