সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকা নাজরানে ইয়েমেন সীমান্তের অতি নিকটে সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেছে। ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সশস্ত্র হামলায় হেলিকপ্টারটি সরাসরি ভূপাতিত হয় এবং এতে অভ্যন্তরীণ দুজন ক্রু সদস্যই প্রাণ হারিয়েছেন বলে আজ রোববার (১৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বরাতে নিশ্চিত হওয়া গেছে। খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ ও আনাদোলুর।
তবে ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি সমর্থিত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে গঠিত সামরিক জোটের শীর্ষ মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি এই হামলাসংক্রান্ত তথ্য অস্বীকার করে জানিয়েছেন, কোনো সশস্ত্র হামলা নয়, বরং মারাত্মক এক আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির দরুনই ‘এএইচ-৬আই’ মডেলের লাইট অ্যাটাক ও গোয়েন্দা হেলিকপ্টারটি ইয়েমেন সীমান্তের কাছে সৌদির নিজস্ব ভূখণ্ডের অভ্যন্তরেই বিধ্বস্ত হয়েছে।
দুর্ঘটনার কবলে পড়া সামরিক হেলিকপ্টারটি মূলতঃ সৌদি আরবের সম্মানজনক ন্যাশনাল গার্ড মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরাসরি পরিচালিত হচ্ছিল এবং তা সীমান্ত প্রহরাকালীন নাজরান এলাকায় ভূপাতিত হয়।
জোটের মুখপাত্র আল-মালিকি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন যে, মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় সামরিক বিমানে থাকা উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ প্রকাশিত এক অফিসিয়াল বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, “সম্পূর্ণ যান্ত্রিক জটিলতার কারণেই এই হেলিকপ্টারটি অকালে বিধ্বস্ত হয়েছে, যার ফলে আমাদের দু’জন নির্ভীক কর্মকর্তা (ক্রু সদস্য) শাহাদাত বরণ করেছেন।”
অন্যদিকে ঘটনাটিকে নিজেদের সরাসরি সামরিক সাফল্য দাবি করে বিবৃতি দিয়েছে ইরান সমর্থিত প্রমোশনধারী শক্তিশালী হুথি বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি, সৌদির নাজরান অঞ্চলের সার্বভৌম আকাশে শত্রুপক্ষের এএইচ-৬আই অ্যাপাচি ঘরানার সামরিক হেলিকপ্টারটিকে তারা নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ভূপাতিত করেছে। সেই মুহূর্তে হেলিকপ্টারটি সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থানরত হুথিদের বিভিন্ন ঘাঁটি ও পর্যবেক্ষণ পোস্ট লক্ষ্য করে বিমান হামলা পরিচালনা করছিল।
গতকাল শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে হুথি নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় প্রধান বার্তাসংস্থা ‘সাবা’-য় প্রকাশিত এক সংবাদে হুথি বাহিনীর প্রধান সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারির একটি অফিসিয়াল বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। ওই বিবৃতিতে ইয়াহিয়া স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের সীমান্তঘেঁষা ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে শত্রুতাপূর্ণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিমান অভিযান চালাচ্ছিল সৌদির আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টারটি। ঠিক সেই সময় আমাদের তৎপর ও সতর্ক যোদ্ধারা পাল্টা হামলা চালিয়ে সেটিকে শূন্যেই ভূপাতিত করে।”
হুথি মুখপাত্রের প্রকাশিত এই সুনির্দিষ্ট সামরিক দাবির ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সৌদি আরব সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য জানানো হয়নি।
উল্লেখ্য, বিগত জুলাই মাস থেকে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের সশস্ত্র সামরিক জোটের মধ্যে পুনরায় ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শুরু থেকেই ইয়েমেনের অভ্যন্তরে হুথিদের গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে অব্যাহত বিমান হামলা চালিয়ে আসছে সৌদি ফাইটার জেট। অন্যদিকে পাল্টা জবাব হিসেবে হুথি বিদ্রোহীরাও সৌদির রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং তাদের প্রধান প্রধান খনিজ তেল পরিশোধনাগার অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক প্রাণঘাতী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৪ সালে হুথি বিদ্রোহীরা আকস্মিক এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইয়েমেনের রাজধানী সানা সহ বেশ কয়েকটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ তাদের দখলে নিয়ে নেয়। এর পরপরই অঞ্চলটিতে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও মানবেতর গৃহযুদ্ধ সূচনা হয়। ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বাসন ও হুথিদের রাজধানী সানা থেকে বিতাড়িত করতে ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইয়েমেনজুড়ে বিস্তৃত বিমান হামলা ও কঠোর অবরোধ চালায় সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সামরিক জোট।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে বিশ্বসংস্থা জাতিসংঘের কার্যকর মধ্যস্থতায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের মধ্যে ঐতিহাসিক এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার সুবাদে মধ্যপ্রাচ্যের এই অংশে দীর্ঘদিন আপেক্ষিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে চলতি বছরের জুলাই মাসে সেই যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে যায়। নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের আগুনে ইতোমধ্যে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সীমান্ত অঞ্চলে কয়েক শত নিরীহ মানুষ ও সামরিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।























