রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনসহ প্রধান কয়েকটি দেশের পণ্য সামগ্রীর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত মার্কিন শুল্ক আরোপের যে বড় নিষেধাজ্ঞা হুমকি তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্ত বিদেশি দেশগুলোর ওপর বিধিনিষেধ ও দ্বিগুণ শুল্ক কার্যকর করার নির্ধারিত চূড়ান্ত সময়সীমা পার হওয়ার ঠিক একদিন আগে গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) গভীর রাতে ট্রাম্প এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মার্কিন নির্বাহী আদেশে নিজের এই বিশেষ পদক্ষেপের সপক্ষে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ’-এর কথা তুলে ধরেছেন ট্রাম্প।
শুক্রবার রাতে হোয়াইট হাউস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ওই নির্বাহী আদেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উল্লেখ করেন, “আমি এতদ্বারা গ্রাহাম আইনে নির্ধারিত সমস্ত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক বিধিনিষেধ এবং অতিরিক্ত শুল্ক প্রয়োগ সাময়িকভাবে মওকুফ ঘোষণা করছি। এই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এ ধরনের নীতিগত ছাড় দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের পক্ষে অত্যন্ত অনুকূল— এই মর্মে আমি মার্কিন কংগ্রেসে একটি আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়নপত্র জমা প্রদান করেছি।”
তবে প্রকাশিত আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই বিশাল শুল্ক ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞাগুলো চিরতরে বাতিল করা হয়নি। বরং এগুলো আপাতত কার্যকর না করে স্থগিতাবস্থায় রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ও ভৌগোলিক স্বার্থ বিবেচনা করে ট্রাম্প চাইলেই যেকোনো সময় পুনরায় আদেশ জারি করে এই শুল্কব্যবস্থা চালু করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, রাশিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করতে মার্কিন আইন প্রণেতাদের পাস করা সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক বিলে স্বাক্ষর করেছিলেন ট্রাম্প। আইনটির নামকরণ করা হয়েছে ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’। মূলত ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের অন্যতম দৃঢ় সমর্থক প্রয়াত মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর নামেই এই কঠোর বিলটির প্রাতিষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়।
কার্যকর হওয়া ওই গ্রাহাম আইনি কাঠামোর আওতায় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ৩০ দিনের নোটিশে রাশিয়ার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা রাষ্ট্র— চীন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত সমস্ত পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের একক সিদ্ধান্তমূলক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল। একই সাথে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা রুশ প্রক্রিয়াজাত জ্বালানির ওপর ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক বসানোর স্পষ্ট ধারা রাখা হয়। আইনটির আওতায় শুল্ক কার্যকরের যে এক মাসের নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, আগামী ১৮ অক্টোবর তা শেষ হওয়ার কথা ছিল।
রাশিয়াবিরোধী নিষেধাজ্ঞা আইনের মূল উদ্দেশ্য
মার্কিন সরকারের এই সংবিধিবদ্ধ আইনের মূল লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর অর্থায়ন ও যুদ্ধের বিশাল ব্যয় মেটানোর রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেওয়া। আর সেই উদ্দেশ্যে রাশিয়ার শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শক্তি ও জ্বালানি খাতের বাণিজ্যিক অংশীদারদের পাশাপাশি মস্কোর সামরিক অভিযানকে যেকোনো উপায়ে মদদ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক ও তৃতীয় কোনো দেশের সংস্থাকে সরাসরি নিশানা করার কড়া বিধান রাখা হয়।
আইনটি ট্রাম্প প্রশাসনকে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কে যুক্ত যেকোনো মুক্ত দেশের ওপর ঢালাও শুল্ক বসানোর আইনি কর্তৃত্ব দেয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এসব দেশ যেন অতিদ্রুত রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নিজেদের নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হয় এবং বৈশ্বিক চাপ বৃদ্ধি করে। তাছাড়া রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ তাঁর প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের বিরুদ্ধেও আর্থিক অবরুদ্ধকরণের নির্দেশনা এতে সংরক্ষিত ছিল।
এই আইনটি পূর্ণাঙ্গভাবে মাঠে কার্যকর হলে রাশিয়ার কাছ থেকে স্বাভাবিক দামে তেল-গ্যাস কেনা দেশগুলোর মার্কিন বাণিজ্যে চরম ক্ষয়ক্ষতি এবং ১০০ শতাংশ শুল্কের মুখোমুখি হতে হতো। এতে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকিতে পড়েছিল ভারত ও চীনসহ বিশ্ব অর্থনীতির মোট ১০টি প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ।
ভারতের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাবের চিত্র
ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি করা সামগ্রীর ওপর হঠাৎ ১০০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক আরোপ করা হলে তা নয়াদিল্লির পুরো রপ্তানি খাতের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করতে পারতো। কারণ, এই নতুন প্রস্তাবিত শুল্কের সাথে সাথে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রচলিত শুল্ক হারও সমান্তরালে বলবৎ থাকতো।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জোরপূর্বক ও অন্যায্য শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানি রোধে ভারত পর্যাপ্ত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না— এমন গুরুতর অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সব ধরনের ভারতীয় পণ্যের ওপর অন্তত ১০ শতাংশ আমদানিকুল শুল্ক বসিয়ে রেখেছে। ফলে নতুন শুল্ক কার্যকর হলে ভারতীয় পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হতো।
প্রসঙ্গত, রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির জেরে গত বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অত্যন্ত কঠোর শুল্কনীতির কারণে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্কে সাময়িক টানাপড়েন দেখা দিয়েছিল। সেই সময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর সাধারণভাবে ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক ধার্যের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের শাস্তিস্বরূপ আরও অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ বিশেষ শুল্ক আরোপ করে ভারত সরকারকে চাপে রেখেছিলেন ট্রাম্প।
তবে পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের ওপর চাপানো অতিরিক্ত ওই ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয় হোয়াইট হাউস। একই সময়কালে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সমঝোতার অংশ হিসেবে দুই দেশের পারস্পরিক শুল্ক হার কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
রুশ তেলের ক্ষেত্রে ভারতের সুস্পষ্ট অবস্থান
গত মাসে মার্কিন কংগ্রেস যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই কঠোর নতুন নিষেধাজ্ঞা বিল পাস করে, তখন ভারত সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে, তারা নিজেদের রাষ্ট্রীয়, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় সব ধরনের দরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেসময় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ভারত সরকার তার দেশের ১৪০ কোটি সাধারণ মানুষের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশীয় চাহিদা মেটাতে বিশ্বের যেকোনো আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সস্তায় জ্বালানি সংগ্রহ করা এবং পরিবর্তনশীল বিশ্ববাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলার এই স্বাধীন নীতি ভারত অব্যাহত রাখবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রতিনিধির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়া থেকে ভারতীয় তেল আমদানির বিষটি খোলামেলা আলোচনা করা হয়েছে। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এই বাণিজ্য ভারতের জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি সামগ্রিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে।
পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির সংকেত
রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর মার্কিন শুল্ক স্থগিতের ট্রাম্পের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এল, যখন ক্রেমলিন ও প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি আগের চেয়ে বেশ ইতিবাচক বলে মনে হচ্ছে। তবে এর ঠিক বিপরীতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও সমালোচনা বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প একাধিক বক্তব্যে এমনকি এ দাবিও করেছেন যে, সংঘাত অবসানে ইউক্রেনে এখন নতুন কোনো যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন এসে পড়েছে।
বিগত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রকাশ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে সম্পাদিত একটি চুক্তির বিস্তারিত তথ্য জানান। সেই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুসারে, রাশিয়া মার্কিন বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারের জন্য অন্তত ৩ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল রপ্তানি করবে। এছাড়া পরবর্তী কয়েক মাসেও যুক্তরাষ্ট্রকে জরুরি সংকট কাটাতে আরও বিপুল পরিমাণ রুশ জ্বালানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার এই নজিরবিহীন জ্বালানি ডিজেল চুক্তির কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তিনি এই চুক্তিকে ‘আমাদের পশ্চিমা মিত্রদের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর’ এবং ‘এক চরম দুর্বল সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেন। জেলেনস্কির অভিযোগ, ওয়াশিংটনের সাথে এই কৌশলগত চুক্তির সুযোগ নিয়ে মস্কো মূলত ইউক্রেনে নিজেদের সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়ার গোপন প্রশ্রয় পাচ্ছে।
তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চিরতরে বন্ধে পুতিনের সাথে কোনো নমনীয় সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ‘অপারগতা ও অনীহা’-র তীব্র সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানান, এখন সময় এসেছে ইউক্রেনীয়দের একজন নতুন দূরদর্শী প্রেসিডেন্ট খুঁজে নেওয়ার।
নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, “আমি কিইভকে স্পষ্ট পরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন দ্রুত এমন একজন নতুন ও যোগ্য নেতা খুঁজে নেয়, যিনি টেবিল আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন। কারণ যেকোনো অজানা কারণে হোক না কেন, জেলেনস্কি সেটি কখনোই করতে সক্ষম হচ্ছেন না।”























