মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান মুখপাত্র বা প্রেস সচিব হিসেবে শপথ নেওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে হোয়াইট হাউসের গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রেস সেক্রেটারি থেকে কেটি জাচারিয়াকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন হোয়াইট হাউস প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই নাটকীয় বিদায়ের খবরটি নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে।
দায়িত্ব পাওয়ার প্রথম দিন থেকেই নানা তর্ক-বিতর্ক ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছিলেন কেটি জাচারিয়া। প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাকে প্রেস সচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ইতোমধ্যেই এই দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছেন।
মূলত দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই তাঁর পেশাগত আইনি যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জটিল প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়া এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদানকালে তাঁর পারফরম্যান্স ও দক্ষতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি থাকতে এমন এক বিদায়ের ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুখপাত্রকে হারালেন। এমন এক মুহূর্তে ঘটনাটি ঘটল, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের মেয়াদের প্রধান অর্জনগুলো ভোটারদের সামনে তুলে ধরতে এবং মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই জানান, দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই সংবাদমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠলে তিনি কেটি জাচারিয়াকে তাঁর চাকরি ও পদমর্যাদা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
নথি অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন কেটি জাচারিয়া। এর পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার তিনি প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সংবাদ ব্রিফিং পরিচালনা করেন। ওই সময় তিনি জানান, গত ৭ অক্টোবর তিনি প্রেসব্রিফিং পদের জন্য একটি বিশেষ বার্তা বা কল পান এবং ক্যারোলিন লেভিটের স্থলাভিষিক্ত হয়ে প্রেস সচিব পদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জাচারিয়ার কর্মজীবন ও পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি দাবি করেছিলেন যে, অতীতে তিনি আইনজীবী হিসেবে সফলভাবে প্র্যাকটিস করেছেন। এমনকি ট্রাম্প নিজেও তাকে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবেই সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
গত বুধবার পাঠানো এক ইমেইল বার্তায় জাচারিয়া দাবি করেছিলেন, “আমি যথাযথ আইনি যোগ্যতা সম্পন্ন হয়েই আন্তর্জাতিক লেনদেন সংক্রান্ত আইন (ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজ্যাকশন ল) প্র্যাকটিস করেছি।”
তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স অনুসন্ধান চালিয়ে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্র বা নথিপত্র খুঁজে পায়নি যা প্রমাণ করে যে, পেপারডিন ইউনিভার্সিটি ল স্কুল থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এই নারী যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্য কিংবা ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া বারের নিবন্ধিত আইনজীবী ছিলেন বা কোনো আইনজীবী সমিতির সক্রিয় সদস্য পদে ছিলেন।
পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয় গত বৃহস্পতিবার, যখন ফক্স নিউজের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে জাচারিয়া নিজেই স্বীকার করেন যে তিনি বার অ্যাসোসিয়েশনের চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কোনো অঙ্গরাজ্যের বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ বা অ্যাডমিশন ছাড়া স্বাধীনভাবে আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ের এই বরখাস্তের বিষয়ে বক্তব্য চেয়ে ইমেইল পাঠানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কেটি জাচারিয়া কিংবা হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। অথচ এর আগে গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জাচারিয়া বলেছিলেন যে, তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সামনে আরও কাজ করতে উন্মুখ হয়ে আছেন।
ঘটনার নেপথ্যের খবর জানা দুজন ব্যক্তির ভাষ্যমতে, ট্রাম্প সম্প্রতি তাঁর প্রশাসনকে নিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রচারিত সংবাদ ও প্রচারণা নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি এমন একজন আত্মবিশ্বাসী মুখপাত্র খুঁজছিলেন, যিনি গণমাধ্যমে তাঁর সরকারের সাফল্যগুলো আরও জোরালো ও আক্রমণাত্মকভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন—মূলত সেই প্রত্যাশা থেকেই তিনি জাচারিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন।
শুক্রবার ফক্স নিউজের সঙ্গে এক টেলিসাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নতুন প্রেস সেক্রেটারি বা মুখপাত্র নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
জাচারিয়ার মাত্র পাঁচ দিনের এই দ্রুত বিদায়ের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রেস সচিব পদে হয়তো তিনিই সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা হিসেবে পরিগণিত হবেন। এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় মাত্র ১০ দিন হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন অ্যান্থনি স্কারামুচি, যা এতদিন ট্রাম্প প্রশাসনে সবচেয়ে কম সময় টিকে থাকার রেকর্ড ছিল।























