ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রেডিমেইড পোশাক ক্রয়ে নতুন শীর্ষে অবস্থান করছে স্পেন। দীর্ঘদিনের প্রধান ক্রেতা জার্মানিকে পেছনে ফেলে এই অঞ্চলে এখন দেশীয় তৈরি পোশাকের সর্ববৃহৎ ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দেশটি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মেয়াদে) স্পেনের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চালান পৌঁছেছে ১১৪ কোটি ৮৪ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের। বিপরীতক্রমে, উক্ত তিন মাসে জার্মান বাজারে তৈরি পোশাক পাঠানো সম্ভব হয়েছে ১১২ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার মূল্যের।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি)-এর সম্মিলিত পরিসংখ্যান বলছে, পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই তিন মাসে বাংলাদেশি পোশাকের জন্য সবচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল জার্মানি। ওই সময় দেশটিতে ১১২ কোটি ৪৭ লাখ ডলার সমপরিমাণ পণ্য সরবরাহ করা হয়েছিল। একই মেয়াদে স্পেনের অর্জন ছিল ১০০ কোটি ৯৮ লাখ ৪৪ হাজার ডলার। গত এক বছরের মধ্যে স্পেন থেকে আসা ক্রয়াদেশে আশাতীত উত্থানের ফলেই এই বিন্যাসে উল্লম্ফন দেখা গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে বাংলাদেশ সর্বমোট ৪৯০ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক প্রস্তুত করে পাঠিয়েছে। পূর্ববর্তী বছরের উক্ত তিন মাসে এই চালানের পরিমাণ ছিল ৪৭৪ কোটি ৬১ লাখ ডলার। অর্থাৎ বার্ষিক ব্যবধানে এই বাজারে পণ্য পাঠানোর হার ১৫ কোটি ৭৯ লাখ ২০ হাজার ডলার বা ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি নথিভুক্ত হয়েছে।
ইউরোপীয় অঞ্চলের সার্বিক এই ইতিবাচক ধারার পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে স্পেন। আগের বছরের একই মেয়াদী হিসাবের তুলনায় এবার স্পেনে তৈরি পোশাক পাঠানো প্রায় ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। টাকার অংকে স্পেনে বাড়ার পরিমাণ ১৩ কোটি ৮৬ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা পুরো ইউরোপীয় এলাকায় বাংলাদেশের নিট প্রবৃদ্ধির প্রায় ৮৮ শতাংশের সমতুল্য। ফলস্বরূপ বলা যায়, ইউরোপের বিশাল পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সাম্প্রতিক অগ্রগতি অনেকাংশেই স্পেনকে কেন্দ্র করে অর্জিত হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডেও অগ্রগতির ধারা
কেবল স্পেনেই সীমাবদ্ধ নয়, ইউরোপের আরও দুটি দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বাণিজ্যে ইতিবাচক রূপ দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নেদারল্যান্ডসে চালান সরবরাহ বেড়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ আর পোল্যান্ডের বেলায় এই হার ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
বিশেষত গত সেপ্টেম্বর মাসে পোল্যান্ডের ক্ষেত্রে পোশাক গ্রহণের হার আশাব্যাঞ্জকভাবে ৩০ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়েছে। পর্যালোচনা করা পাঁচটি বড় দেশের মধ্যে এটি ছিল এক মাসে আসা সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধির দৃষ্টান্ত, যা পোলেণ্ডীয় বাজারে স্থানীয় পোশাকের চাহিদার ধারাবাহিক রূপ স্পষ্ট করে।
তবে ইউরোপ মহাদেশের প্রতিটি প্রধান অর্থনীতিতে একই সমান সুবাতাস বয়ে যায়নি। আলোচ্য তিন মাসে জার্মানিতে বাংলাদেশের পোশাক পাঠানো গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ০ দশমিক ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফ্রান্সে পরিমাপ কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। তাছাড়া ইইউ জোটের বাদবাকি রাষ্ট্রগুলো মিলিয়ে মোট পতন রেকর্ড করা হয়েছে ২ দশমিক ২৪ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ
প্রথম তিন মাসের সামগ্রিক ফলাফলের পাশাপাশি এককভাবে সেপ্টেম্বর মাসেও ইইউ জোটভুক্ত রাষ্ট্রগুলোতে দেশীয় পোশাকের চালান গতি পেয়েছে। ওই একক মাসে বাণিজ্য ছাড়িয়েছে ১৪১ কোটি ১ লাখ ১০ হাজার ডলারের, যা এক বছর আগের সেপ্টেম্বর মাসের মোট অংকের তুলনায় ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি।
অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ড থেকে চাহিদাপত্র বাড়লেও জার্মানি ও ফ্রান্সের ক্ষেত্রে তা নিম্নমুখী বা স্থবির অবস্থায় আটকা পড়েছে। এর ফলে বোঝা যায় ইউরোপজুড়ে তৈরি পোশাক চালানের বিকাশ সব জায়গায় সমানভাবে ছড়ায়নি; বরং কিছু নির্দিষ্ট বাজারের উল্লেখযোগ্য অবদানের ওপর ভর করেই সার্বিক সংখ্যা ধনাত্মক রাখা সম্ভব হয়েছে।
ইউরোপীয় পরিসরে স্পেনের এই শীর্ষ স্থান দখল করা বাংলাদেশি তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মোড়। তবে স্বল্পমেয়াদী কেবল একটি প্রান্তিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পূর্ণ চিত্র আঁকা সঠিক হবে না। আগামী দিনের মাসগুলোতেও স্পেনের ধারাবহিকতা অব্যাহত থাকে কি না এবং পাশাপাশি জার্মানি ও ফ্রান্সের মত প্রথাগত বাজারগুলো পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন রয়েছে।























