গণপিটুনিতে মৃত্যুর দীর্ঘ দুই বছর পর চাঁদপুরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও চলচ্চিত্র প্রযোজক সেলিম খান এবং তার ছেলে অভিনেতা শান্ত খানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। আজ বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ৮টার দিকে চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের স্থানীয় কবরস্থান থেকে তাদের মরদেহ দুটি উত্তোলন করা হয়। এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রত্যয় হাশেম, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চাঁদ মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঐতিহাসিক দিনে এলাকা ছেড়ে পালানোর সময় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন সেলিম খান ও তার ছেলে শান্ত খান। সে সময় কোনো ধরনের ময়নাতদন্ত ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে তাদের দাফন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে পুনরায় তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এবার কবর থেকে তাদের মরদেহ উত্তোলন করা হলো।
পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করার সময় সাধারণ জনতার তীব্র গণপিটুনিতে সেলিম খান ও শান্ত খান ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এই চাঞ্চল্যকর মৃত্যুর ঘটনার পর চাঁদপুর সদর মডেল থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশি তদন্ত ও সামগ্রিক আইনি প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ হিসেবে আদালত ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে মরদেহ দুটি কবর থেকে উত্তোলনের আদেশ প্রদান করেন। চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান যে, আদালতের লিখিত নির্দেশ হাতে পাওয়ার পর পরই মরদেহ উত্তোলনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যথাযথ অনুমোদন পাওয়ার পরই বুধবার আদালতের নির্দেশনা ও আইনি বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করে মরদেহ দুটি মাটি থেকে উত্তোলন করা হয়েছে।
মরদেহ উত্তোলনের পর চাঁদপুরের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ নূর আল দীন গণমাধ্যমকে জানান যে, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অনেক সময় ঘটনার বহু দিন পরও কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করার আইনি প্রয়োজন দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে মরদেহের পেশি ও নরম টিস্যু নষ্ট হয়ে গেলেও ময়নাতদন্তের ক্ষেত্রে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক দিক ও আলামত বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব। উল্লেখ্য, নিহত সেলিম খান চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি দেশের চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখ ছিলেন এবং চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান ‘শাপলা মিডিয়া’-র স্বত্বাধিকারী হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তার ছেলে শান্ত খানও চলচ্চিত্র অঙ্গনে অভিনেতা হিসেবে নিয়মিত কাজ করতেন।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সেলিম খানের বিরুদ্ধে চাঁদপুরের প্রবহমান পদ্মা ও মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং রাজস্ব-সংক্রান্ত বিভিন্ন দপ্তরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও অনুসন্ধান চলমান ছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় মরদেহের স্বাভাবিক শারীরিক গঠনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। তা সত্ত্বেও ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব নির্ভুল তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা হবে। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট ধরন, শরীরে থাকা আঘাতের বিভিন্ন চিহ্নসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং মামলার দাপ্তরিক নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে ৫ আগস্টের ওই মর্মান্তিক ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ চিত্র উদঘাটন করার চেষ্টা চালানো হবে।


























