নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের অন্তর্গত চকমাহাপুর গ্রামে ঝোপঝাড় ও জঙ্গলের আড়ালে ঢেকে রয়েছে প্রায় তিন শতাব্দীর পুরোনো এক ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে প্রাচীন এই নিদর্শনটি ‘আবদালের মসজিদ’ নামে পরিচিত। উপযুক্ত তদারকি, সংস্কারের অভাব এবং প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার কারণে প্রত্নসম্পদটি বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ছাদবিহীন ভাঙাচোরা কাঠামো, ফাটা ইটের দেয়াল এবং গম্বুজের সামান্য চিহ্ন ছাড়া এই প্রাচীন স্থাপত্যের মূল অবয়ব এখন আর অবশিষ্ট নেই।
স্থানীয় ইতিহাস গবেষক তথা আনসার-ভিডিপির সাবেক কর্মকর্তা আজিজুর রহমান জানান, আনুমানিক ৩০০ বছর আগে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর শাসনকালে চকমাহাপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষজন এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন সময়ে উক্ত অঞ্চলে ঝিনুক ও শামুক পুড়িয়ে চুন তৈরি করার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এই চুনশিল্পের সাথে জড়িত বিশেষ পেশাজীবী মুসলিম জনগোষ্ঠীই আবদাল সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত ছিলেন, যারা এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে নদী ভরাট হয়ে গেলে চুন তৈরির মূল কাঁচামাল ঝিনুক ও শামুকের অভাব দেখা দেয় এবং চুন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে আবদাল সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হন। তাদের প্রস্থান করার পর থেকে মসজিদটি জনমানবহীন ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে।
সরেজমিনে চকমাহাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়ক থেকে প্রায় ২০০ গজ পশ্চিমে লতাপাতায় ঘেরা জঙ্গলের মধ্যে মসজিদটির ভগ্নাবশেষ দৃশ্যমান। আনুমানিক ১৯ শতক উঁচু ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই কাঠামোর ১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থের অবশিষ্ট দেয়ালগুলোতে এখনো প্রাচীন লতাপাতা ও নিখুঁত ফুলের নকশা ভেসে ওঠে। সেখানে পাঁচটি প্রবেশদ্বারের স্পষ্ট চিহ্নও দেখা যায়। তবে দেয়ালের ফাটলে বাসা বাঁধা বড় বড় বৃক্ষের শিকড় প্রাচীন এই ইটের দেওয়ালগুলোকে দিন দিন আরও বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত করছে। এই মূল স্থাপনাটুকুকে ঘিরে থাকা পারিপার্শ্বিক জমির কিছু অংশে স্থানীয় কৃষক মোস্তাক মণ্ডল বর্তমানে হলুদ চাষাবাদ করছেন।
কৃষক মোস্তাক মণ্ডল ব্যক্ত করেন যে, এলাকা ত্যাগ করার প্রাক্কালে আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষজন তাদের পূর্বপুরুষদের হাতে এই জমি হস্তান্তর করে গিয়েছিলেন। তাই জরাজীর্ণ এই মসজিদটি তাদের কাছে প্রবীণদের স্মৃতিস্বরূপ। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকারিভাবে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপত্যটি সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তাদের কোনো প্রকার আপত্তি থাকবে না। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব তছির উদ্দিন উল্লেখ করেন, শৈশবকাল থেকেই তিনি মসজিদটিকে একই জরাজীর্ণ দশায় দেখে আসছেন। পূর্বে এর আশেপাশে আরও একাধিক প্রাচীন কাঠামো ও ইটের সীমানা প্রাচীর বিদ্যমান ছিল, যা পরবর্তীতে মানুষজন খুলে নিয়ে গেছে; বর্তমানে কেবল কয়েকটি দেয়াল ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন জানান, স্থানটি পরিষ্কার রাখা ও প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলবেন।
অন্যদিকে বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুল ইসলাম গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, স্থানটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য পরীক্ষা করে দেখা হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব প্রমাণিত হলে জাতীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাথে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে এটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।


























