মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে সাহায্য তুলে কঠিন রোগ থেকে নিজ ছেলের চিকিৎসা করিয়েছেন। ইমামতির সামান্য আয়ে সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে তাকে পড়াশোনা শিখিয়ে বানিয়েছেন হাফেজ ও মাওলানা। অথচ সেই সন্তান আজ বড় হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নিজের চরম অসুস্থতার দিনগুলোতে তার কাছ থেকে ন্যূনতম কোনো সহযোগিতাই পাচ্ছেন না বলে এক বুক অভিমান নিয়ে গণমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন হাফেজ তাশরীফের বৃদ্ধ বাবা। তাঁর কষ্টের দাবি, শতবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি তাঁর নিজের ছেলের কোনো ইতিবাচক সাড়া পান না।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের করুণ কষ্ট, বঞ্চনা ও ছেলের বিরুদ্ধে জমে থাকা গভীর অভিমানের কথা অকপটে তুলে ধরেন এই অসহায় পিতা।
হাফেজ তাশরীফের বাবা তাঁর অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ছোটবেলায় তাঁর সন্তানের প্রস্রাব সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক রোগ হয়েছিল। সেই সময় সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য তাঁকে মানুষের কাছে হাত পেতে সাহায্য চাইতে হয়েছিল। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল, ময়মনসিংহ এবং মির্জাপুরের বিভিন্ন ক্লিনিকে দীর্ঘ সময় ধরে ছেলের চিকিৎসা করাতে হয়েছে তাঁকে। ইমামতি করে যৎসামান্য যা আয় হতো, তা দিয়ে চারিত্রিক সংসার চালানোর পাশাপাশি ব্যয়বহুল ছেলের চিকিৎসার খরচ চালানো তাঁর পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “অনেক ত্যাগ ও কষ্ট সহ্য করে আমি ওর চিকিৎসা করিয়েছি। আল্লাহ তাআলা দয়া করে তাকে সুস্থ করেছেন। তাকে ঠিকমতো পড়ালেখা করিয়ে হাফেজ ও মাওলানা বানিয়েছি। অথচ আজ সে সেই অতীত অস্বীকার করে।”
নিজের বর্তমান শারীরিক অসুস্থতার কথা বর্ণনা করে হাফেজ তাশরীফের বাবা জানান, শরীরে বাসা বাঁধা নানান রোগের চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর জন্য তিনি একপর্যায়ে ছেলের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে জমি কেনার সুনির্দিষ্ট অজুহাত দেখিয়ে ছেলে তাঁকে তখন কোনো অর্থ দিতে পারেনি বলে তাঁর দাবি। পরবর্তীতে উপায়ান্তর না পেয়ে তিনি বাধ্য হয়ে গণমাধ্যমের সহযোগিতায় সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্য প্রার্থনা করে কিছু অর্থ সংগ্রহ করেন। সেই সাহায্য পাওয়া টাকায় কোনোমতে চিকিৎসা করালেও তিনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি এবং বর্তমানেও অসুস্থ শরীর নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ছেলের সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে না পারার চরম কষ্টের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি বারবার ফোন করলেও ছেলে তাঁর ফোনের কোনো সাড়া দেয় না। এমনকি ছেলের ব্যক্তিগত সহকারী ওবায়দুল্লাহর সাথে যোগাযোগ করেও প্রতিশ্রুত কোনো অর্থ তিনি পাননি। একপর্যায়ে বারবার ফোন করার কারণে তার ব্যক্তিগত সহযোগীরাও বিরক্ত বোধ করে ফোন ধরা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ।
সন্তানের বর্তমান সামাজিক অবস্থান নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আজ ওর অনেক টাকা-পয়সা হয়েছে এবং চারপাশে বন্ধুবান্ধবেরও কোনো অভাব নেই। আগে কি ওর এত বন্ধু বা লোকবল ছিল? আমি নিজের রক্ত পানি করা কষ্টে তাকে পড়ালেখা শিখিয়ে বড় মানুষ করেছি। অথচ আজ আমার দুর্দিনে সে আমার জন্য সামান্য কিছুও করে না।”
ছেলের পক্ষ থেকে মাসিক আর্থিক সহায়তা পাওয়ার একটি আশ্বাসের কথাও সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, সম্প্রতি ভাটারা বাজার মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালনকালে ছেলে তাঁর কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল। সে সময় ছেলে আগামীতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ‘চেয়ারম্যান’ পদে প্রার্থী হওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা তাঁকে জানায়। পরে সে প্রতি মাসে নিয়মিত ১০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার বড় আশ্বাস দিলে তিনি বাধ্য হয়ে তাঁর ইমামতির চাকরিটি ছেড়ে দেন। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরও ছেলে তাঁকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দেয়নি বলে তাঁর জোরালো অভিযোগ।
গত ঈদুল আজহার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, ছেলে যখন কোরবানি দেওয়ার কথা জানিয়েছিল, তখন তিনি নিজেই এলাকার গরিব ও দুঃখী মানুষের মধ্যে সেই মাংস সুষমভাবে বিতরণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার বিষয় হলো, ছেলের বন্ধুবান্ধব ও আশপাশের সবাইকে কুরবানির মাংস দেওয়া হলেও তাঁকে এক টুকরো মাংসও দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
সন্তানকে ঘিরে নিজের অন্তরের গভীর অভিমান ও কান্নার সুর প্রকাশ করে তিনি শেষ পর্যন্ত বলেন, “যখন তোমার এই দুনিয়ায় কেউ ছিল না, তখন একমাত্র আমিই তোমার পাশে ছিলাম। আর আজ তোমার সবকিছু হয়েছে, অথচ আমি তোমার কাছে পুরোপুরি পর হয়ে গেলাম। আমি আজ চরম কষ্টের মধ্যে আছি। সৃষ্টিকর্তা চাইলে আমার টাকা-পয়সার প্রয়োজন নেই, তিনিই আমাকে চালাবেন। কিন্তু জন্মদাতা পিতা হিসেবে নিজের সন্তান যখন কোনো খোঁজখবরই নেয় না, তখন অন্তরে গভীর কষ্ট লাগে।”


























