আফ্রিকা আজ এক নিঃশব্দ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মহাদেশজুড়ে কলেরার ভয়াবহ বিস্তার যেন জীবনের প্রতিটি শিরায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের এ পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন কলেরা রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় এক তৃতীয়াংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
এ বছর এখন পর্যন্ত সাত হাজারেরও বেশি মানুষ এই ব্যাধিতে প্রাণ হারিয়েছেন। আফ্রিকা সিডিসির মহাপরিচালক জিন কাসেয়া বলেন, “প্রতি বছরই আমরা আরও বেশি সংখ্যক রোগীর মুখোমুখি হচ্ছি, কলেরা যেন আমাদের ছায়ার মতো পিছু ছাড়ছে না।”
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা দেখা দিয়েছে অ্যাঙ্গোলা ও বুরুন্ডিতে, যেখানে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অ্যাঙ্গোলায় এখন পর্যন্ত ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, আর মৃত্যু হয়েছে ৮৬৬ জনের। বুরুন্ডিতে আক্রান্ত দুই হাজারের বেশি, মৃত্যু অন্তত ১০ জনের।
কলেরা মূলত দূষিত পানি পান করার মাধ্যমে ছড়ায়, কখনও কখনও সংক্রমিত পানিতে ক্ষতস্থান লাগলে কিংবা কাঁচা সামুদ্রিক খাবার খাওয়ার ফলেও এটি ছড়াতে পারে। এটি মানুষে মানুষে সংক্রমিত হয় না, তবে চিকিৎসা না হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু ঘটাতে পারে।
আফ্রিকা সিডিসি জানায়, নিরাপদ পানির অভাব, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি এই মহামারির বিস্তারের প্রধান কারণ। কাসেয়া বলেন, “পরিষ্কার পানি ছাড়া কোনোভাবেই এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।”
যেসব দেশে রোগের হার কিছুটা কমেছে, সেসব দেশকেও সতর্ক থাকতে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। কারণ শরণার্থী শিবিরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অতিরিক্ত ভিড় এখনও বিপদের প্রধান উৎস হয়ে আছে।
সুদানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। শুধু দারফুর অঞ্চলেই চলতি বছরে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডাক্তার্স উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সুদানের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে পানিশোধনাগার ও নিকাশী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ফলে রাজধানী খার্তুমসহ বহু এলাকা পরিণত হয়েছে মৃত্যুর উপত্যকায়।
সংস্থাটি বলেছে, “যুদ্ধের ভেতরেও মানুষ টিকে থাকার চেষ্টা করছে, কিন্তু এখন তারা লড়ছে আরেকটি অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে—কলেরা।” শুধু গত সপ্তাহেই দারফুরে সংস্থাটির টিম ২৩০০ রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে এবং ৪০টি মৃত্যু নথিভুক্ত করেছে।
আফ্রিকা সিডিসির তথ্যানুসারে, সুদানে এ বছর অন্তত ৭১ হাজারের বেশি মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু ঘটেছে দুই হাজারেরও বেশি মানুষের।
২০১৭ সালেও দেশটিতে এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল, তখন দুই মাসে প্রায় ২২ হাজার মানুষ আক্রান্ত ও ৭০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ বন্যার পানির সঙ্গে নিকাশী মিশে যাওয়ায় পানির উৎসগুলো বিষে পরিণত হয়েছে।
আফ্রিকার মাটিতে যেন আজ এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে—জীবন বনাম দূষণ, স্বাস্থ্য বনাম অবহেলা। কিন্তু এই যুদ্ধের জয় নির্ভর করছে একটিমাত্র বিষয়ের ওপর—পরিষ্কার পানির প্রবাহ আর মানবতার সজীব চেতনা পুনরুদ্ধারে।
















