দেশের প্রবীণ নাগরিকদের জীবনমানের উন্নয়ন, পরিচর্যা ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন আটটি ‘শান্তিনিবাস’ উদ্বোধনের দীর্ঘ তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো একজন প্রবীণ মানুষেরও সেখানে আশ্রয় পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের পেছনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮২ কোটি টাকা। অথচ প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো ও নিয়মিত বাজেট বরাদ্দের অভাবে দৃষ্টিনন্দন এই ভবনগুলো আজ ধুলাবালি, শেওলা আর পোকার দখলে চলে গেছে।
প্রকল্পের পটভূমি পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই বিশেষ শান্তিনিবাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ৭৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও কাজের শ্লথগতির কারণে তা বাড়িয়ে ৮২ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয় এবং ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর জাঁকজমকপূর্ণভাবে একযোগে দেশের আটটি জেলায় এই নিবাসগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালী জেলার শান্তিনিবাসগুলো শুধু নারীদের জন্য এবং ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল জেলার নিবাসগুলো পুরুষ প্রবীণদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে ২৫ জন করে মোট ২০০ জন প্রবীণ ব্যক্তির একসঙ্গে বসবাসের সম্পূর্ণ সুব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে এগুলো সম্পূর্ণ অব্যবহৃত পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জেলায় শান্তিনিবাসগুলোর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহের শান্তিনিবাসগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ থাকায় ভবনের ভেতরের দামি আসবাবপত্র, শরীরচর্চার আধুনিক সরঞ্জাম, থেরাপি ও চিকিৎসাসামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথাও ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে আসবাব ভিজছে, আবার কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কিংবা লিফট ও পাম্প অচল হয়ে পড়ে আছে। এমনকি রাজশাহীতে শান্তিনিবাসের ভবনে চলচ্চিত্র শুটিংয়ের ঘটনা এবং নোয়াখালীতে বন্যার কারণে শিশু পরিবারের সদস্যদের সাময়িক আশ্রয়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় নাগরিকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যকার এই বিরাট ব্যবধান ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণেই মহৎ এই উদ্যোগ মুখথুবড়ে পড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জনে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.২৮ শতাংশ। এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যখন দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে, তখন কোটি টাকার এই শান্তিনিবাসগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকা অত্যন্ত মর্মান্তিক।
দীর্ঘ এই স্থবিরতার অবসান ঘটিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। সংস্থাটির মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব জানিয়েছেন যে, এতদিন প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে শান্তিনিবাসগুলো চালু করা সম্ভব না হলেও গত মাসেই এগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যেই সবকটি শান্তিনিবাস আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, যার মাধ্যমে জীবনের শেষ গোধূলিলগ্নে দেশের অবহেলিত প্রবীণ মানুষগুলো একটু সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।


























