মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়া, চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করা এবং পরবর্তীতে দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যাওয়ার মতো চরম প্রতিকূলতা—কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাকে। জীবনের সব বাধা এবং মৃত্যুর দুয়ার থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে এসে অবশেষে মায়ের দেখা সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কৃতিসন্তান এস এম তাইজুল ইসলাম। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে ১২০তম স্থান অর্জন করে তিনি সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের সাধারণ এক মুসলিম পরিবারের সন্তান এই তাইজুল। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদরাসা থেকে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করে তিনি এলাকায় এক ঐতিহাসিক সাফল্যের সৃষ্টি করেন। এরপর ২০১০ সালে স্বনামধন্য ঢাকা কলেজ থেকে সফলভাবে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে, যেখান থেকে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।
তবে ২০১৩ সাল থেকেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর, ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই তার শরীরের দুটি কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে। সেই সংকটময় মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধু, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ, আত্মীয়স্বজন এবং দেশের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতায় ২০১৭ সালে ভারতের একটি হাসপাতালে সফলভাবে তার কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়।
জীবন-মৃত্যুর এই কঠিন সন্ধিক্ষণ এবং শত শত প্রতিবন্ধকতা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করে অবশেষে সহকারী জজ হিসেবে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার খবরে এখন আনন্দের জোয়ার বইছে তার পরিবার ও পুরো এলাকায়। আবেগাপ্লুত ও অশ্রুসজল কন্ঠে তার মমতাময়ী মা হাওয়া বেগম বলেন, ‘একবেলা না খেয়ে অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে আমি আমার সন্তানদের তিল তিল করে মানুষ করেছি। আমার হৃদয়ে একটাই স্বপ্ন ছিল—আমার ছেলে একদিন দেশের একজন বিচারক হবে; পরম করুণাময় আল্লাহ আজ আমার সেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।’
সফল হওয়া এস এম তাইজুল ইসলাম নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘মহান আল্লাহর অসীম রহমত, আমার মায়ের জীবনের অমর ত্যাগ এবং দেশের অসংখ্য মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কাছে আমি চিরজীবন কৃতজ্ঞ ও ঋণী থাকব। শতভাগ সত্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিচারকার্য পরিচালনা করে আমি আজীবন সাধারণ মানুষের সেবা করে যেতে চাই।’


























