ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো ভয়ংকর বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ইরানে অবস্থানরত সব আমেরিকান নাগরিককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশটি ত্যাগ করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থানরত সমস্ত মার্কিন নাগরিক ও দূতাবাসগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ স্কাই নিউজের ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক শন বেলসহ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে মূল কারণ হলো গত কিছুদিন আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেখানে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য গাজা ও লেবাননে আগ্রাসন থামানো এবং মার্কিন ব্যাংকে জব্দকৃত ইরানের অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো বেশ কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ইরান তার অবস্থান থেকে এক চুলও সরে না আসায় এবং নিজেদের শর্তের কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন।
তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডীসহ বিশিষ্ট সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত ৪০ দিনের দীর্ঘ বোমা হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইতিমধ্যেই ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হানার দাবি করলেও ইরানের মূল সামরিক স্থাপনাগুলো ভূগর্ভস্থ বা মাটির নিচে অবস্থিত হওয়ায় আমেরিকা কাঙ্ক্ষিত ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারেনি। সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল ডেনিয়েল ডেভিস সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি এবার ভুল করে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল-গ্যাস ক্ষেত্র কিংবা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো জ্বালানি খাতে হামলা চালায়, তবে ইরান মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন মিত্র সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া বেলজিয়ান সাংবাদিক অ্যালাইজা ম্যগনেইর মনে করেন, ইরান সম্ভাব্য হামলার জবাবে সবার আগে সাগরে অবস্থানরত মার্কিন রণতরীগুলোতে ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালাবে।
বর্তমান আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরেকটি ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ফক্স নিউজ ও ফ্রান্স২৪-এর প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আশানুরূপ সামরিক সহায়তা পাচ্ছে না এবং ট্রাম্প প্রশাসন শেষ মুহূর্তে এসে হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর নির্দেশও বাতিল করেছে। আগামী নভেম্বরের মিড-টার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের আশঙ্কা এবং নতুন কোনো যুদ্ধ বাধার কারণে সম্ভাব্য ইম্পিচমেন্টের ঝুঁকি ট্রাম্পকে চরম চাপে রেখেছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপসহ আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, এই রাজনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থা থেকে বের হতে আগামী অক্টোবরে কোনো বড় ধরনের ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে ইরান যদি এই সময়ের মধ্যে তাদের দীর্ঘদিনের গুঞ্জন সত্যি করে পারমাণবিক অস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায় কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক ক্ষমতার ঘোষণা দেয়, তবে তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটে প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় এগিয়ে থাকা ইরানের কৌশলের কাছে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এখন এক কঠিন ও জটিল এক্সিট র্যাম্প বা প্রস্থানের রাস্তার সন্ধানে রয়েছে।























