চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার বর্তমান দূরত্ব এখনো বেশ খানিকটা রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তেহরানের এক উচ্চপদস্থ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সদ্যসমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মাঝে ফের যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের বিধ্বংসী সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা তীব্র করা হলেও, শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা এখনও যথেষ্ট অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
এরই মধ্যে গত সোমবার গভীর রাতে ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে সুনির্দিষ্ট ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং যুদ্ধাস্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত রাখা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য বেশ কিছু শত্রুপক্ষীয় ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু ভেদ করতেই মূলত এই আকস্মিক হামলা চালানো হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রশাসনের অপর এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, পরিচালিত এই বিমান হামলাগুলো অত্যন্ত সীমিত ও সুনির্দিষ্ট পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে নতুন করে কোনো সর্বাত্মক সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার সুদূরপ্রসারী কোনো ইঙ্গিত বা বার্তা দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসন এবং তা পুনরায় সারা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কার মুখে দুই দেশের উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা বহুগুণ জোরদার করেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্র কাতার। বিশেষ করে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে কূটনৈতিক মহল বাড়তি তৎপরতা শুরু করেছে।
ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক মতপার্থক্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা অত্যন্ত আন্তরিক ও জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।” বিগত আট দিন ধরে চলমান খসড়া চুক্তির একটি বিশেষ সংস্করণ নিয়ে উভয় পক্ষের মাঝে মতপার্থক্য দূর করার উদ্দেশ্যে গত সোমবার রাতে কাতারের উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতাকারীরা সরাসরি তেহরান সফর করেন।
এদিকে গত মঙ্গলবার কাতারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান—উভয় দেশই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে নিজেদের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবগুলোও তারা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখছে। সম্প্রতি তেহরান সফর সম্পন্ন করে কাতারের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল দোহায় ফিরে গেলেও দুই পক্ষের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা এখনো নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি।
তিনি এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ও সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়া এড়াতে এই অঞ্চলের বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় ও যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।” অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো গঠনমূলক আলোচনার পথ সুগম করতে একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছানো শেষ পর্যন্ত সম্ভব হবে বলেও দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে নাম প্রকাশ না করার কঠোর শর্তে ইরানের ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তেহরানের পক্ষ থেকে দেওয়া শর্তগুলো পুরোপুরি পূরণ হওয়ার পরই কেবল পারমাণবিক অস্ত্র বা কার্যক্রম সংক্রান্ত পরবর্তী আলোচনা শুরু হতে পারে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আরোপিত কোনো ধরনের ‘অতিরিক্ত ও অন্যায্য দাবি’ ইরান কোনো অবস্থাতেই মেনে নেবে না। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এর বাইরেও অত্যন্ত শক্তিশালী ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে বলে মার্কিন প্রশাসনকে কঠোর সতর্কবার্তা দেন তিনি।
বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে, দাবি ইরানের: এদিকে বর্তমান সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, আলোচনার বর্তমান টেবিলে বল সম্পূর্ণভাবে এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে রয়েছে। তেহরান তাদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ‘শক্তিশালী ও অত্যন্ত যৌক্তিক জবাব’ প্রদান করেছে।
স্পিকার গালিবাফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নির্বোধ শত্রুপক্ষ ফন্দি এঁটেছে যে, নানা ধরনের হুমকি প্রদর্শন এবং নগ্ন সামরিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বীরের জাতি ইরানকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু তারা এক মারাত্মক ও ঐতিহাসিক ভুল হিসাব কষছে। ইরান কখনোই কোনো শক্তির কাছে মাথা নত বা আত্মসমর্পণ করবে না।”
যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্ররা যদি আর কোনো ভুল হিসাব বা হঠকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তার পরিণতি হবে পুরোপুরি অননুমেয় এবং সেই জবাব নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমারেখার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও নতুন করে ইরানে সর্বাত্মক সামরিক হামলা শুরু করতে পারেন—এমন তীব্র আশঙ্কায় এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি ও সতর্কাবস্থা নেওয়া হয়েছে।























