যুক্তরাষ্ট্রের এবারের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টিকে নজিরবিহীন এক রাজনৈতিক ধাক্কা দিয়ে দেশটির আইনসভার নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেওয়ার সুদৃঢ় পথে রয়েছে প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। একই সঙ্গে টেক্সাস, ওহাইও এবং সাউথ ক্যারোলাইনার মতো কট্টর রক্ষণশীল রিপাবলিকানদের তথাকথিত ‘নিরাপদ ও শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও’ অভাবনীয় ও চমকপ্রদ জয় ছিনিয়ে নিয়ে মার্কিন সিনেটেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চূড়ান্ত দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং মার্কিন শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্বাভাস ও নির্বাচনী বিশ্লেষণে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
হালনাগাদ নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেনটাকি, নিউ জার্সি এবং নর্থ ক্যারোলাইনা সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে অন্তত আটটি করে রিপাবলিকান পার্টির আসন সফলভাবে নিজেদের দখলে নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা আইনসভার নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার অত্যন্ত জোরালো অবস্থানে রয়েছে। এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল ও রিপাবলিকানদের শক্ত দূর্গ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নিজেদের দারুণ সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
চলমান সিনেট নির্বাচনে বেশ কিছু বড় ধরনের রাজনৈতিক অঘটন ও চমক পরিলক্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে ওহাইও অঙ্গরাজ্যে প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে মার্কিন সিনেটে পুনরায় ফিরে আসছেন বিশিষ্ট ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরড ব্রাউন। অন্যদিকে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রতিপক্ষ শিবিরের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের মুখে দুর্নীতি ও বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত বিতর্কিত রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে শোচনীয় ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছেন উদীয়মান ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা জেমস তালারিকো।
এ ছাড়াও সাউথ ক্যারোলাইনায় সাবেক রক্ষণশীল সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের প্রয়াণের পর তাঁর শূন্য আসনে ক্ষমতাসীন দলের টিকিটে দায়িত্ব পাওয়া ডারলিন গ্রাহামকে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত করে গোটা দেশবাসীর নজর কেড়েছেন বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। এর আগে নর্থ ক্যারোলাইনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচনেও দোহাইহীন বড় জয় তুলে নেন অভিজ্ঞ ডেমোক্র্যাট নেতা রয় কুপার।
রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, মিশিগান এবং মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে নিজেদের বর্তমান আসনগুলো অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হলে মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করতে ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজনমতো অতিরিক্ত চারটি আসনের কাঙ্ক্ষিত সমীকরণ ইতিমধ্যেই পুরোপুরি মিলে গেছে। এর পাশাপাশি জর্জিয়া এবং নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনেও নিজেদের দলীয় আসনগুলো সাফল্যের সঙ্গে ধরে রেখেছেন ডেমোক্র্যাটরা।
জর্জিয়ায় দলীয় প্রার্থীর ঐতিহাসিক জয়ের পর আয়োজিত এক প্রাণবন্ত বিজয় সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ওসফ বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, “একটি ব্যাপক, অংশগ্রহণমূলক ও চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন দেশের সাধারণ জনগণ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প নামের একজন ব্যক্তির প্রশাসনিক অবক্ষয়, চরম দুর্নীতি এবং নেতৃত্বসুলভ অযোগ্যতাকে সরাসরি ও স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।”
এদিকে কংগ্রেসে নিজেদের দীর্ঘদিনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য হারানোর গুরুতর ঝুঁকি স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের অবস্থান সাফাই গেয়ে লিখেছেন, “আসন্ন এই ব্যালটে আমার নিজস্ব নাম সরাসরি যুক্ত ছিল না। যদি আমার নাম ব্যালটে থাকত, তবে আমরা অবশ্যই এক বিশাল ও বিপুল ব্যবধানে এই নির্বাচনে জয়লাভ করতে সক্ষম হতাম! আজকের এই বিশেষ বিষয়টির প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ ও মনোযোগ দেওয়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানাই।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়া এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া চলমান ইরান যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাটি ভোটারদের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) সহ দেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে পরিচালিত দেশব্যাপী বুথফেরত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে যে, এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে আসা ভোটারদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এই নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান নীতির প্রতি নিজেদের গভীর অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। উক্ত জনমত জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোটার দেশের বর্তমান সার্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার জোরালোভাবে জানিয়েছেন যে, হোয়াইট হাউসের বর্তমান নির্বাহী ক্ষমতার ওপর মার্কিন কংগ্রেসের আরও বহুগুণ বেশি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি।
পরিস্থিতির গভীরতা এতটাই তীব্র ছিল যে, কট্টর রক্ষণশীল ও শক্ত রিপাবলিকান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাঞ্জি নিক্সনের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর মাত্র ৩ শতাংশ ভোটের অতি ক্ষুদ্র ব্যবধানে নিজেদের দলীয় আসন কোনোমতে রক্ষা করতে পেরেছেন রক্ষণশীল রিপাবলিকান সিনেটর অ্যাশলে মুডি।
এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সার্বিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ এবং কঠোর নজরদারির স্বার্থে মার্কিন বিচার বিভাগ দেশের সমস্ত ৫০টি অঙ্গরাজ্যে মোট প্রায় এক হাজার স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও তদারককারী দল মাঠে মোতায়েন করেছিল, যাকে দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও কঠোর প্রশাসনিক তদারকি অভিযান হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তবে ডেমোক্র্যাট শিবিরের পক্ষ থেকে তীব্র অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, এই বিশাল প্রশাসনিক পর্যবেক্ষক দল মোতায়েন করার মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত সাধারণ ভোটারদের মানসিকভাবে প্রভাবিত, ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত করা।























