যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কোনো মুসলিম সিনেটর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির উদীয়মান রাজনীতিক আব্দুল এল-সায়েদ। দেশটির বহুল আলোচিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেটর পদে বড় ব্যবধানে বিজয়ের প্রায় সুনিশ্চিত দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন তিনি। চলমান ভোট গণনার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৪১ বছর বয়সী এই প্রগতিশীল প্রার্থীর বিজয়ের আনুষ্ঠানিক সম্ভাবনা এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার।
মার্কিন শীর্ষ সারির গণমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, উক্ত অঙ্গরাজ্যের মোট গণনাকৃত ভোটের প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হওয়া শেষে আব্দুল এল-সায়েদ একাই পেয়েছেন ১৭ লাখ ৮২ হাজার ৪৬৪টি ভোট, যা গণনাকৃত মোট ভোটের প্রায় ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে তাঁর মূল ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থী রজার্স ১৬ লাখ ৫ হাজার ৭০৭টি ভোট পেয়ে অর্জনে সক্ষম হয়েছেন ৪৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট। বর্তমানে ভোটের এই বিশাল ও দৃশ্যমান ব্যবধান পর্যালোচনা করে দেশটির মূলধারার প্রচারমাধ্যমগুলো সায়েদের ঐতিহাসিক বিজয়কে প্রায় নিশ্চিত ধরে নিয়ে বিশেষ পূর্বাভাস সম্প্রচার করছে।
তবে আব্দুল এল-সায়েদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির সর্বোচ্চ ধাপ বা সিনেটের এই ঐতিহাসিক নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পথটি সামান্যতমও সুগম ছিল না। নির্বাচনী যাত্রার শুরুতেই নিজ দলের অভ্যন্তরীণ প্রাইমারি নির্বাচনে প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা হেলি স্টিভেনসকে শক্ত প্রতিযোগিতায় পরাজিত করে সিনেট নির্বাচনের চূড়ান্ত টিকিট ছিনিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই পরাজয়ের তিক্ততা থেকে নির্বাচনের ঠিক মাত্র দুদিন আগে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী সায়েদের পক্ষ ত্যাগ করে প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানিয়ে অবস্থান নেন স্টিভেনস।
দলের এই অভ্যন্তরীণ বিবাদ ও চরম বিশ্বাসঘাতকতার পাশাপাশি পুরো নির্বাচনী প্রচারণাজুড়ে প্রতিপক্ষ শিবিরের পক্ষ থেকে আসা তীব্র ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ইসলামফোবিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি স্বয়ং সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিভিন্ন জনসভায় এল-সায়েদকে লক্ষ্য করে কুরুচিপূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন এবং একপর্যায়ে তাঁকে প্রকাশ্যে ‘জঙ্গি’ ও ‘জিহাদি’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছিলেন।
তবে সমস্ত রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কুৎসা ও ধর্মীয় বিদ্বেষকে শক্ত হাতে সামলে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যসেবা খাত পুনর্গঠন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চরম সংকটগুলো সমাধান করাকেই নিজের নির্বাচনী প্রচারণার মূল হাতিয়ার বানিয়েছিলেন আব্দুল এল-সায়েদ। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ও জোরালো ভাষায় বলেছিলেন, “আমি নিছক কোনো মুসলিম সিনেটর হওয়ার জন্য নির্বাচনে দাঁড়াইনি, বরং মিশিগানের প্রতিটি সাধারণ ও মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছি।”
উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকারী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ সিনেটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন হয় ন্যূনতম ৫০টি আসন। এর আগে ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোট ৫৩টি আসনে জয়লাভ করে উচ্চকক্ষে রিপাবলিকান পার্টি নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ধরে রেখেছিল। তবে চলতি মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের নজিরবিহীন রাজনৈতিক ভরাডুবি ঘটেছে। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়া এই ঐতিহাসিক ফলাফলের সুবাদে ইতিমধ্যেই অন্তত ৫৪টি আসনে একচ্ছত্র জয় ছিনিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের কবজায় নিয়ে নিয়েছে।























