Dhaka ০২:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

বান্দরবানের পাহাড়ে ‘ইকো রিসোর্ট’-এর নামে অপরিকল্পিত স্থাপনার মহোৎসব

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১২:০০:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • ৬ বার দেখা হয়েছে

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের পাহাড়ের বুক চিরে একটুকরো খালি জায়গা কিংবা নজরকাড়া ভিউ পয়েন্ট পেলেই সেখানে যত্রতত্র গড়ে তোলা হচ্ছে নানা ধরনের কটেজ, রিসোর্ট কিংবা মাচাংঘর। পাহাড়ের চ চূড়া, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল, নদীর কিনারা কিংবা উজাড় হওয়া ন্যাড়া পাহাড়—কোনো স্থানই রেহাই পাচ্ছে না এসব আবাসন ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ থেকে। মাশরুমের মতো ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব বাণিজ্যিক স্থাপনার গায়ে ‘ইকো রিসোর্ট’ বা পরিবেশবান্ধব রিসোর্টের তকমা লাগানো হলেও, বাস্তবতার সঙ্গে সেই পরিবেশ সুরক্ষার সুদূরপ্রসারী কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাহাড়ি বনাঞ্চল ও গাছপালা কেটে তৈরি করা হচ্ছে সমতল জায়গা, আবার কোথাও ন্যাড়া পাহাড়ের বুকে গড়ে তোলা হচ্ছে রঙিন ইট-কাঠের কটেজ। প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যকে মূলধন বানিয়ে কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসা জমজমাট হলেও, সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার কার্যকর উদ্যোগ কতটা বিদ্যমান—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এসব অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনার একটি বড় অংশে পাহাড়ে প্রাকৃতিক ঢাল নির্বিচারে কেটে তৈরি করা হয়েছে চলাচলের রাস্তা ও সমতল প্রাঙ্গণ। সিংহভাগ স্থানেই নেই কোনো ধরনের পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশনের সঠিক অবকাঠামো। এর ফলে একদিকে যেমন পাহাড়ের স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতি ও বাস্তুসংস্থানের (ইকোসিস্টেম) ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্যের কারণে নদী ও ঝিরির পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। কেবল প্রাকৃতিক রূপ উপভোগের তীব্র আকর্ষণে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ছুটে এলেও, পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনাক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ একেবারে অনুপস্থিত। ফলে ইকো-ট্যুরিজমের নামে এসব অসাধু আয়োজন পাহাড়ে প্রকৃতির জন্য ঠিক কতটা সহায়ক, নাকি শেষ পর্যন্ত মহাবিপর্যয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে—তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এদিকে বান্দরবানে গজিয়ে ওঠা পর্যটন স্থাপনাগুলোর আইনি বৈধতা ও জমির মালিকানা নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম ধোঁয়াশা। কারো হাতে জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া সাধারণ আবেদনপত্র, কারো হাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নেওয়া ট্রেড লাইসেন্স, আবার কেউ কেউ কোনো প্রকার প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ উঠে এসেছে, নানামুখী আইনি নিয়মনীতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রহস্যজনক ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ কটেজ ও কমার্শিয়াল রিসোর্ট মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।

পাহাড়ের লিজ নেওয়া জমি ও সরকারি খাস জমি ব্যবহারের ধরনেও লক্ষ্য করা গেছে নানাবিধ অনিয়ম। কোথাও রাবার বাগান তৈরি কিংবা হর্টিকালচার কৃষি প্রকল্পের নামে সরকারিভাবে লিজ নেওয়া জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বিলাসবহুল সব পর্যটন রিসোর্ট। আবার কোথাও সরকারি খাস পাহাড়ের শত শত একর জমি দখল করে অবৈধ কটেজ বানানোর জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী অধিবাসীরা জানান, বান্দরবানের মূল পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এখন পাহাড়ের চূড়া পর্যটকদের কাছে একটু জনপ্রিয় বা দৃষ্টিনন্দন মনে হলেই সেখানে অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। বান্দরবানজুড়ে যেখানেই পাহাড়, সেখানেই রিসোর্ট তৈরির এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব স্থাপনার বিশাল এক অংশের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। ট্রেড লাইসেন্স বা আবেদনপত্র ঝুলিয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা চালানো হচ্ছে। ফলে কাগজপত্র থাকা বা না থাকার অদ্ভুত এক বিশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্য দিয়েই পাহাড় ধ্বংস করে বাড়ছে রিসোর্ট ব্যবসা।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও পাহাড়ি মাচাংঘর গড়ে উঠেছে। অথচ বান্দরবান জেলা প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব মতে, জেলায় অনুমোদিত হোটেল ও রিসোর্টের অফিসিয়াল সংখ্যা মাত্র ৭৯টি। আর সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে সাকুল্যে মাত্র ৩২টি স্থাপনার। ফলে বাকি শত শত স্থাপনার চূড়ান্ত বৈধতা, নিরাপত্তা ও সরকারি অনুমোদন নিয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি বান্দরবান সদর, লামা, আলীকদম, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন দুর্গম পর্যটন পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, যে পাহাড়ের চূড়া বা ঢাল থেকে আকর্ষণীয় দৃশ্য দেখা যায়, সেটাই এখন রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রথম শিকারে পরিণত হচ্ছে। কোথাও পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে নির্মিত হয়েছে কাঠ ও বাঁশের ঝুঁকিপূর্ণ মাচাংঘর, কোথাও আবার ইট-কংক্রিট বা টিন ও ছন দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে কটেজ। পাহাড়ে সামান্য সমতল জায়গা পেলেই সেখানে তৈরি হচ্ছে টং-ঘর ও খাবারের দোকান।

পর্যটকদের কাছ থেকে অবস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করে এসব কটেজের রাতপ্রতি ভাড়া হাঁকানো হচ্ছে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে অবিশ্বাস্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এমনকি ছন, কাঠ ও টিনের তৈরি সাধারণ মাচাংঘরের ভাড়াও ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। পাহাড়ের সৌন্দর্য বিক্রি করে স্থানীয় পর্যায়ে কোটি টাকার ব্যবসা চললেও পরিবেশ সুরক্ষায় বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। জেলার লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পর্যটন এলাকায় বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।

মিরিঞ্জা এলাকার ‘মিরিঞ্জা ভ্যালি’ রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান বলেন, “মিরিঞ্জা এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৮৯টি ছোট-বড় রিসোর্ট রয়েছে। এসবের অনেকেই কেবল স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন কিংবা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো জরুরি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো অনুমোদন অনেকেরই নেই।”

লামা রিসোর্ট মালিক সমিতির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন রফিক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “লামায় মোট কতটি রিসোর্ট বা কটেজ গড়ে উঠেছে, তার সঠিক কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব বা তালিকা আমাদের সমিতিতেও নেই। এখানে ব্যবসায়ীদের সমিতি থাকলেও কেউ কারো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ বা নির্দেশ শুনছেন না।”

পাহাড়ি জমিতে রিসোর্ট তৈরির প্রেক্ষাপটে জমির প্রকৃত সত্ত্ব ও ব্যবহার নিয়ে নানা আইনি প্রশ্ন উঠেছে। রিসোর্ট ব্যবসায় যুক্ত একাধিক ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, মিরিঞ্জা পাহাড় এলাকার বিপুল পরিমাণ জমি আগে রাবার চাষের জন্য সরকারিভাবে লিজ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে চাষাবাদের পরিবর্তে কোনো কোনো জায়গায় প্রথমে জুমঘর বা কাঠামোর রূপ দিয়ে পর্যটকদের যাতায়াত শুরু করানো হয় এবং পরে তা স্থায়ী কটেজে রূপ নেয়। আবার সরকারি মালিকানাধীন খাস পাহাড় দখল করে রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগও বেশ পুরনো।

পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করা উয়ই সিং উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “পাহাড়ের ঢাল কাটা, বনাঞ্চলের গাছপালা নিধন ও স্বাভাবিক ঝিরি-ছড়া ভরাট করার কারণে বান্দরবানের প্রাকৃতিক ভারসাম্য চূড়ান্তভাবে নষ্ট হচ্ছে। একই সাথে চিরতরে ধ্বংস হচ্ছে বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল। রিসোর্টগুলো থেকে নিঃসৃত তরল ও কঠিন বর্জ্য পাহাড়ের নিচে নদী-নালা ও পাহাড়ি ঝিরিতে মিশে বিশুদ্ধ পানিকে তীব্র দূষিত করছে।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, “বিগত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ি বনাঞ্চলের বড় বড় চূড়ায় ‘ইকো’ নামের আড়ালে একের পর এক বাণিজ্যিক রিসোর্ট গড়ে তোলা হচ্ছে। অধিকাংশের পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাথমিক ছাড়পত্রও নেই। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বদলে পাহাড়ি এলাকা অপরিকল্পিত ঘনবসতি ও পাকা কটেজের স্তূপে পরিণত হবে। তাই প্রশাসনকে অবিলম্বে একটি কড়া নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।”

রিসোর্টগুলোর ফেলে দেওয়া অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বর্তমানে স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও ওয়ানটাইম খাবারের প্যাকেট পাহাড়ের ঢাল ও ঝিরিতে ফেলে রাখা হচ্ছে। কোথাও বর্জ্যে আগুন দিয়ে পরিবেশ দূষণের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

লামা উপজেলার ইয়াংছা পাড়ার মারমা সম্প্রদায়ের বাসিন্দা মংচিং মার্মা ক্ষোভের সাথে জানান, রিসোর্টগুলোর বর্জ্য পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়ায় সরাসরি এসে পড়ায় তাদের ব্যবহারের একমাত্র সুপেয় পানির উৎসটি দুর্গন্ধযুক্ত ও মারাত্মক বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। রান্নাবান্না ও গোসলসহ দৈনন্দিন জরুরি কাজে বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সেই দূষিত পানিই ব্যবহার করতে হচ্ছে।

লামার মিরিঞ্জাসহ নতুন সব পর্যটন স্পটে গড়ে ওঠা অনেক কটেজ কাঠ, বাঁশ, ছন ও টিন দিয়ে তৈরি হওয়ায় সেখানে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু কোনো রিসোর্টেই নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখা হয়নি। তদুপরি, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের ভারী গাড়ি চলাচলের মতো ন্যূনতম সড়ক অবকাঠামোও নেই।

বান্দরবান জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবদুল মান্নান আনসারী জানান, জেলায় বর্তমানে সঠিক কতটি হোটেল-রিসোর্ট চালু রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ ফায়ার সার্ভিসের কাছে নেই। তবে প্রায় ৬০টি হোটেল ও রিসোর্ট ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ছাড়পত্র নবায়ন করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, কাঠ, বাঁশ ও ছনের তৈরি অনেক কটেজেই আগুন নেভানোর ন্যূনতম প্রস্তুতি নেই। দুর্গম পাহাড়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার সড়ক না থাকায় বড় ধরনের আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব জানান, জেলার আনুমানিক পাঁচ শতাধিক রিসোর্টের মধ্যে মাত্র ৩২টি রিসোর্ট নিয়ম মেনে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। তবে কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে অবৈধভাবে চলতে থাকা বাকি রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে পর্যটন হস্তান্তরের প্রশাসনিক দিক তুলে ধরে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য লুসাই মং মারমা বলেন, ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বিধান অনুযায়ী ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে স্থানীয় পর্যটন খাতকে হস্তান্তরিত করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ ১২ বছর পার হয়ে গেলেও জেলা পরিষদ এখনো পর্যটন স্থাপনা পরিচালনা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বর্তমানে পর্যটন খাতের সমস্যাগুলো দূর করতে প্রশাসন ও সব পক্ষের সমন্বয়ে কাজ করার চেষ্টা চলছে।

বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস. এম. হাসান সার্বিক বিষয়ে জানান, অপরিকল্পিত রিসোর্ট গড়ে ওঠার পুরো বিষয়টি জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে এসব হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে নোটিশ ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, যাতে তারা ভাড়ার মান সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নবায়ন করে নেন। অন্যথায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জনপ্রিয়

পুলিশকে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বের করে আনা হয়েছে: তথ্য উপদেষ্টা

বান্দরবানের পাহাড়ে ‘ইকো রিসোর্ট’-এর নামে অপরিকল্পিত স্থাপনার মহোৎসব

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১২:০০:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের পাহাড়ের বুক চিরে একটুকরো খালি জায়গা কিংবা নজরকাড়া ভিউ পয়েন্ট পেলেই সেখানে যত্রতত্র গড়ে তোলা হচ্ছে নানা ধরনের কটেজ, রিসোর্ট কিংবা মাচাংঘর। পাহাড়ের চ চূড়া, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল, নদীর কিনারা কিংবা উজাড় হওয়া ন্যাড়া পাহাড়—কোনো স্থানই রেহাই পাচ্ছে না এসব আবাসন ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ থেকে। মাশরুমের মতো ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব বাণিজ্যিক স্থাপনার গায়ে ‘ইকো রিসোর্ট’ বা পরিবেশবান্ধব রিসোর্টের তকমা লাগানো হলেও, বাস্তবতার সঙ্গে সেই পরিবেশ সুরক্ষার সুদূরপ্রসারী কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাহাড়ি বনাঞ্চল ও গাছপালা কেটে তৈরি করা হচ্ছে সমতল জায়গা, আবার কোথাও ন্যাড়া পাহাড়ের বুকে গড়ে তোলা হচ্ছে রঙিন ইট-কাঠের কটেজ। প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যকে মূলধন বানিয়ে কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসা জমজমাট হলেও, সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার কার্যকর উদ্যোগ কতটা বিদ্যমান—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এসব অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনার একটি বড় অংশে পাহাড়ে প্রাকৃতিক ঢাল নির্বিচারে কেটে তৈরি করা হয়েছে চলাচলের রাস্তা ও সমতল প্রাঙ্গণ। সিংহভাগ স্থানেই নেই কোনো ধরনের পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশনের সঠিক অবকাঠামো। এর ফলে একদিকে যেমন পাহাড়ের স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতি ও বাস্তুসংস্থানের (ইকোসিস্টেম) ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্যের কারণে নদী ও ঝিরির পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। কেবল প্রাকৃতিক রূপ উপভোগের তীব্র আকর্ষণে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ছুটে এলেও, পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনাক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ একেবারে অনুপস্থিত। ফলে ইকো-ট্যুরিজমের নামে এসব অসাধু আয়োজন পাহাড়ে প্রকৃতির জন্য ঠিক কতটা সহায়ক, নাকি শেষ পর্যন্ত মহাবিপর্যয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে—তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এদিকে বান্দরবানে গজিয়ে ওঠা পর্যটন স্থাপনাগুলোর আইনি বৈধতা ও জমির মালিকানা নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম ধোঁয়াশা। কারো হাতে জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া সাধারণ আবেদনপত্র, কারো হাতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নেওয়া ট্রেড লাইসেন্স, আবার কেউ কেউ কোনো প্রকার প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে নির্বিঘ্নে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ উঠে এসেছে, নানামুখী আইনি নিয়মনীতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রহস্যজনক ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ কটেজ ও কমার্শিয়াল রিসোর্ট মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।

পাহাড়ের লিজ নেওয়া জমি ও সরকারি খাস জমি ব্যবহারের ধরনেও লক্ষ্য করা গেছে নানাবিধ অনিয়ম। কোথাও রাবার বাগান তৈরি কিংবা হর্টিকালচার কৃষি প্রকল্পের নামে সরকারিভাবে লিজ নেওয়া জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বিলাসবহুল সব পর্যটন রিসোর্ট। আবার কোথাও সরকারি খাস পাহাড়ের শত শত একর জমি দখল করে অবৈধ কটেজ বানানোর জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী অধিবাসীরা জানান, বান্দরবানের মূল পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এখন পাহাড়ের চূড়া পর্যটকদের কাছে একটু জনপ্রিয় বা দৃষ্টিনন্দন মনে হলেই সেখানে অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। বান্দরবানজুড়ে যেখানেই পাহাড়, সেখানেই রিসোর্ট তৈরির এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এসব স্থাপনার বিশাল এক অংশের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। ট্রেড লাইসেন্স বা আবেদনপত্র ঝুলিয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা চালানো হচ্ছে। ফলে কাগজপত্র থাকা বা না থাকার অদ্ভুত এক বিশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্য দিয়েই পাহাড় ধ্বংস করে বাড়ছে রিসোর্ট ব্যবসা।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও পাহাড়ি মাচাংঘর গড়ে উঠেছে। অথচ বান্দরবান জেলা প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব মতে, জেলায় অনুমোদিত হোটেল ও রিসোর্টের অফিসিয়াল সংখ্যা মাত্র ৭৯টি। আর সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে সাকুল্যে মাত্র ৩২টি স্থাপনার। ফলে বাকি শত শত স্থাপনার চূড়ান্ত বৈধতা, নিরাপত্তা ও সরকারি অনুমোদন নিয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি বান্দরবান সদর, লামা, আলীকদম, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন দুর্গম পর্যটন পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, যে পাহাড়ের চূড়া বা ঢাল থেকে আকর্ষণীয় দৃশ্য দেখা যায়, সেটাই এখন রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রথম শিকারে পরিণত হচ্ছে। কোথাও পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে নির্মিত হয়েছে কাঠ ও বাঁশের ঝুঁকিপূর্ণ মাচাংঘর, কোথাও আবার ইট-কংক্রিট বা টিন ও ছন দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে কটেজ। পাহাড়ে সামান্য সমতল জায়গা পেলেই সেখানে তৈরি হচ্ছে টং-ঘর ও খাবারের দোকান।

পর্যটকদের কাছ থেকে অবস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করে এসব কটেজের রাতপ্রতি ভাড়া হাঁকানো হচ্ছে ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে অবিশ্বাস্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এমনকি ছন, কাঠ ও টিনের তৈরি সাধারণ মাচাংঘরের ভাড়াও ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। পাহাড়ের সৌন্দর্য বিক্রি করে স্থানীয় পর্যায়ে কোটি টাকার ব্যবসা চললেও পরিবেশ সুরক্ষায় বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। জেলার লামা উপজেলার মিরিঞ্জা পর্যটন এলাকায় বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।

মিরিঞ্জা এলাকার ‘মিরিঞ্জা ভ্যালি’ রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান বলেন, “মিরিঞ্জা এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৮৯টি ছোট-বড় রিসোর্ট রয়েছে। এসবের অনেকেই কেবল স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন কিংবা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো জরুরি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো অনুমোদন অনেকেরই নেই।”

লামা রিসোর্ট মালিক সমিতির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন রফিক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “লামায় মোট কতটি রিসোর্ট বা কটেজ গড়ে উঠেছে, তার সঠিক কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব বা তালিকা আমাদের সমিতিতেও নেই। এখানে ব্যবসায়ীদের সমিতি থাকলেও কেউ কারো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ বা নির্দেশ শুনছেন না।”

পাহাড়ি জমিতে রিসোর্ট তৈরির প্রেক্ষাপটে জমির প্রকৃত সত্ত্ব ও ব্যবহার নিয়ে নানা আইনি প্রশ্ন উঠেছে। রিসোর্ট ব্যবসায় যুক্ত একাধিক ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, মিরিঞ্জা পাহাড় এলাকার বিপুল পরিমাণ জমি আগে রাবার চাষের জন্য সরকারিভাবে লিজ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে চাষাবাদের পরিবর্তে কোনো কোনো জায়গায় প্রথমে জুমঘর বা কাঠামোর রূপ দিয়ে পর্যটকদের যাতায়াত শুরু করানো হয় এবং পরে তা স্থায়ী কটেজে রূপ নেয়। আবার সরকারি মালিকানাধীন খাস পাহাড় দখল করে রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগও বেশ পুরনো।

পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করা উয়ই সিং উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “পাহাড়ের ঢাল কাটা, বনাঞ্চলের গাছপালা নিধন ও স্বাভাবিক ঝিরি-ছড়া ভরাট করার কারণে বান্দরবানের প্রাকৃতিক ভারসাম্য চূড়ান্তভাবে নষ্ট হচ্ছে। একই সাথে চিরতরে ধ্বংস হচ্ছে বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল। রিসোর্টগুলো থেকে নিঃসৃত তরল ও কঠিন বর্জ্য পাহাড়ের নিচে নদী-নালা ও পাহাড়ি ঝিরিতে মিশে বিশুদ্ধ পানিকে তীব্র দূষিত করছে।”

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, “বিগত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ি বনাঞ্চলের বড় বড় চূড়ায় ‘ইকো’ নামের আড়ালে একের পর এক বাণিজ্যিক রিসোর্ট গড়ে তোলা হচ্ছে। অধিকাংশের পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাথমিক ছাড়পত্রও নেই। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বদলে পাহাড়ি এলাকা অপরিকল্পিত ঘনবসতি ও পাকা কটেজের স্তূপে পরিণত হবে। তাই প্রশাসনকে অবিলম্বে একটি কড়া নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।”

রিসোর্টগুলোর ফেলে দেওয়া অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বর্তমানে স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও ওয়ানটাইম খাবারের প্যাকেট পাহাড়ের ঢাল ও ঝিরিতে ফেলে রাখা হচ্ছে। কোথাও বর্জ্যে আগুন দিয়ে পরিবেশ দূষণের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

লামা উপজেলার ইয়াংছা পাড়ার মারমা সম্প্রদায়ের বাসিন্দা মংচিং মার্মা ক্ষোভের সাথে জানান, রিসোর্টগুলোর বর্জ্য পাহাড়ি ঝিরি ও ছড়ায় সরাসরি এসে পড়ায় তাদের ব্যবহারের একমাত্র সুপেয় পানির উৎসটি দুর্গন্ধযুক্ত ও মারাত্মক বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। রান্নাবান্না ও গোসলসহ দৈনন্দিন জরুরি কাজে বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সেই দূষিত পানিই ব্যবহার করতে হচ্ছে।

লামার মিরিঞ্জাসহ নতুন সব পর্যটন স্পটে গড়ে ওঠা অনেক কটেজ কাঠ, বাঁশ, ছন ও টিন দিয়ে তৈরি হওয়ায় সেখানে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু কোনো রিসোর্টেই নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখা হয়নি। তদুপরি, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের ভারী গাড়ি চলাচলের মতো ন্যূনতম সড়ক অবকাঠামোও নেই।

বান্দরবান জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবদুল মান্নান আনসারী জানান, জেলায় বর্তমানে সঠিক কতটি হোটেল-রিসোর্ট চালু রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ ফায়ার সার্ভিসের কাছে নেই। তবে প্রায় ৬০টি হোটেল ও রিসোর্ট ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ছাড়পত্র নবায়ন করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, কাঠ, বাঁশ ও ছনের তৈরি অনেক কটেজেই আগুন নেভানোর ন্যূনতম প্রস্তুতি নেই। দুর্গম পাহাড়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার সড়ক না থাকায় বড় ধরনের আগুন লাগলে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব জানান, জেলার আনুমানিক পাঁচ শতাধিক রিসোর্টের মধ্যে মাত্র ৩২টি রিসোর্ট নিয়ম মেনে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। তবে কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে অবৈধভাবে চলতে থাকা বাকি রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে পর্যটন হস্তান্তরের প্রশাসনিক দিক তুলে ধরে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য লুসাই মং মারমা বলেন, ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বিধান অনুযায়ী ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে স্থানীয় পর্যটন খাতকে হস্তান্তরিত করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ ১২ বছর পার হয়ে গেলেও জেলা পরিষদ এখনো পর্যটন স্থাপনা পরিচালনা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বর্তমানে পর্যটন খাতের সমস্যাগুলো দূর করতে প্রশাসন ও সব পক্ষের সমন্বয়ে কাজ করার চেষ্টা চলছে।

বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস. এম. হাসান সার্বিক বিষয়ে জানান, অপরিকল্পিত রিসোর্ট গড়ে ওঠার পুরো বিষয়টি জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে এসব হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে নোটিশ ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, যাতে তারা ভাড়ার মান সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নবায়ন করে নেন। অন্যথায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।