মধ্যপ্রাচ্যের উদ্ভূত গভীর সামরিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনর্থক নির্ভর করার কোনো প্রয়োজন নেই বলে অত্যন্ত জোরালো মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় অনুষ্ঠিত গ্যাস রফতানিকারক দেশগুলোর ফোরামের (জিইসিএফ) সম্মেলনের ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তেহরানের এই সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান ব্যক্ত করেন তিনি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত জ্বালানি খাত এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা বহুগুণ বাড়ানোর বিষয়েও দুই রাষ্ট্রপ্রধান দীর্ঘ আলোচনা করেন।
ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার নতুন আশঙ্কা যখন ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক তখনই দুই পরাশক্তি নেতার মধ্যে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আক্রমণের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক যে সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তার অবসান ঘটাতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা বর্তমানে সম্পূর্ণ থমকে রয়েছে। বিশ্বরাজনীতি ও সামরিক ক্ষেত্রে এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সচেষ্ট হয়েছে ইরান।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলাপে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের দেশগুলো যেকোনো বহিরাগত চাপ মুক্ত হয়ে নিজেরাই নিজেদের মধ্যকার জটিল রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরানকে অনবরত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন জোগানোর জন্য তিনি রুশ প্রেসিডেন্টের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তাঁর অভিমত, ওয়াশিংটনের একতরফা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্বনীতি মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা সার্বভৌম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির এক নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে।
বৈঠকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে এই উত্তপ্ত সংকট শেষ পর্যন্ত একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক সমাধানের দিকে ধাবিত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যবর্তী তিক্ত শত্রুতা ও বিরোধ নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়ে আসছে মস্কো।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি তেল ও গ্যাস সরবরাহসহ কৌশলগত জ্বালানি খাতে নিজেদের পারস্পরিক বাণিজ্য বহুগুণ বাড়াতে আগ্রহী মস্কো ও তেহরান। বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় উভয় দেশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস খাতের বেশ কয়েকটি যৌথ মেগা প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেন দুই নেতা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই কেবল রাশিয়া ও ইরানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজের অগ্রগতিও সন্তোষজনকভাবে দ্রুত এগিয়ে চলছে বলে বৈঠকে নিশ্চিত করেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।
ইরানে বর্তমানে বছরে প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ঘনমিটার বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে রাশিয়ার অত্যাধুনিক কারিগরি, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জোরালো আহ্বান জানান পেজেশকিয়ান। ভৌগোলিক ও কৌশলগত বন্ধন মজবুত করতে আগামী ২০২৫ সালে উভয় দেশ একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরও করে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিয়ে এক যৌথ সমাধানের জোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) ইরানের রাজধানী তেহরানে ইরান, প্রতিরক্ষা খাতে প্রভাবশালী সৌদি আরব, আঞ্চলিক শক্তি তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ সেনা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। সে সময় আঞ্চলিক স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে পরস্পরের মধ্যকার সংলাপ ও সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেন।
ঐতিহাসিক সেই চারদলীয় বৈঠকে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনির এবং তুরস্কের প্রভাবশালী গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সেখানে দৃঢ়তার সাথে রেজায়ি বলেন, যেকোনো বহিরাগত পরাশক্তির ক্ষতিকর হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকেই মধ্যপ্রাচ্যের পূর্ণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব ও উচিত।
একই সাথে মস্কোয় সফররত কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গেও পৃথক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মধ্যপ্রাচ্যের চরম সংকট কাটিয়ে উঠতে যেকোনো গঠনমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা পালনে রাশিয়া সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ইরান সফরে যান রাশিয়ার অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। উক্ত সফর শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মন্তব্য করেন, রাশিয়া ও ইরানের বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এ যাবৎকালের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি ঘনিষ্ঠ ও সুদৃঢ়।























