ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচনে প্রকাশিত প্রাথমিক বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোলগুলোর ফলাফলে এক বিশাল রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছেন দেশটির দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর সরাসরি নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট দলগুলো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে পিছিয়ে পড়ায় দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রধান পাবলিক ব্রডকাস্টার তাদের এক বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণে নেতানিয়াহুকে ইতিমধ্যেই এবারের নির্বাচনের ‘সবচেয়ে বড় পরাজিত ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
শীর্ষস্থানীয় ওই গণমাধ্যমটির প্রধান শিরোনামে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে, “নির্বাচনে চূড়ান্তভাবে ঠিক কে জয়লাভ করেছে তা এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ অস্পষ্ট হলেও, এতে ইতোমধ্যে একজন সবচেয়ে বড় পরাজিত ব্যক্তি রয়েছেন—আর তিনি হলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।” বুথফেরত জরিপে নিজের রাজনৈতিক শিবিরে সম্ভাব্য ভরাডুবির অশনিসঙ্কেত দেখতে পেয়েই চরম তৎপর হয়ে উঠেছেন নেতানিয়াহু। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর জোটের বিভিন্ন শরিক দলীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জরুরি টেলিফোন আলাপ শুরু করেছেন এবং উদ্ভূত কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁর দল লিকুদ পার্টির সব সদস্যকে সংবাদমাধ্যমে সরাসরি কোনো ধরনের সাক্ষাৎকার বা বক্তব্য দেওয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কড়া নির্দেশ জারি করেছেন বলে জনপ্রিয় ইসরায়েলি দৈনিক ‘ইয়েদিওথ আহরোনথ’ তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে।
এদিকে বুথফেরত জরিপের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলকে নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোটের জন্য একটি “মারাত্মক পরাজয়” ও সম্পূর্ণ ধস হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেশের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিড। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক জোরালো পোস্টে তিনি লিখেছেন, “এ দেশের আপামর সাধারণ মানুষ তাদের ব্যালটের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে চিরতরে ঘরে ফিরে যাওয়ার বার্তা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে।”
একই সুরে সুর মিলিয়ে ইয়াশার পার্টির সম্মানিত নেতা গাদি আইজেনকোট মন্তব্য করেছেন যে, প্রকাশিত এই প্রাথমিক পূর্বাভাসগুলো মূলত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তাঁর কট্টর সরকারের প্রতি সাধারণ জনগণের চরম অনাস্থা ও ক্ষোভের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এই প্রাথমিক নির্বাচনী ফলাফল যদি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে সমর্থিত হয়, তবে তিনি অবিলম্বে সাধারণ ভোটারদের সুনির্দিষ্ট ইচ্ছা ও রায়কে সম্মান জানিয়ে বর্তমান নেতানিয়াহু প্রশাসনকে অপসারণ করে একটি নতুন ও গ্রহণযোগ্য সরকার গঠনের জন্য সর্বাত্মক কাজ করবেন। নতুন সেই সরকারে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বা কনস্ক্রিপশন প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া ডেমোক্র্যাটস পার্টির শীর্ষ নেতা ইয়ার গোলানও তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “দেশের জনগণ ইতিমধ্যে তাদের সুনির্দিষ্ট রায় প্রদান করেছে এবং তারা নেতানিয়াহুর অজনপ্রিয় সরকারকে সরাসরি বরখাস্ত করেছে।” তিনি বর্তমান এই অবস্থাকে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে এক প্রকৃত ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নের এক ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইসরায়েলের মোট ১২০ আসন বিশিষ্ট একক কক্ষের পার্লামেন্ট বা নেসেটে সরকার গঠন করার জন্য যেকোনো দল বা জোটকে জাদুকরী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ন্যূনতম ৬১টি আসন পেতেই হয়। তবে ইসরায়েলি পাবলিক ব্রডকাস্টার এবং প্রভাবশালী চ্যানেল ১৩-এর যৌথ বুথফেরত জরিপের উপাত্ত অনুযায়ী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ব্লক মাত্র ৫০টি আসন পেতে পারে, অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের ব্লক ৫৩টি এবং গুরুত্বপূর্ণ আরব দলগুলো প্রায় ১৭টি আসন লাভ করতে পারে। এর বিপরীতে চ্যানেল ১২-এর আলাদা পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর ব্লককে ঠিক ৫০টি, আইজেনকোটের ব্লককে ৫২টি এবং আরব দলগুলোকে ১৮টি আসন প্রদান করা হয়েছে।
এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে, কোনো একক রাজনৈতিক পক্ষ বা জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদুকরী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না। চ্যানেল ১২ আরও বিশদভাবে জানিয়েছে যে, এবারের নির্বাচনে দেশের সংখ্যালঘু আরব ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির হার ছিল অবিশ্বাস্য প্রায় ৮০ শতাংশ, যা মূলত আরব দলগুলোর জন্য ইতিহাসের পাতায় এক বিশাল রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে গণ্য হবে। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, এবারের সাধারণ নির্বাচনে সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৭৭.৭ শতাংশ, যা সুদূর ১৯৯৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ঠিক ১০টায় সারা দেশে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হওয়ার পরপরই ভোট গণনার কাজ শুরু হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন থেকে চূড়ান্ত ও দাপ্তরিক ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এই বুথফেরত জরিপগুলোকে প্রাথমিক পূর্বাভাস হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।























