আফ্রিকার জনবহুল দেশ নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় তারাবা রাজ্যের একটি সুদূর প্রান্তিক গ্রামে অতর্কিত সশস্ত্র বন্দুকধারীদের বর্বরোচিত হামলায় অন্তত ২০ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জোরালো দাবি করেছেন। গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) পবিত্র জুমার নামাজ আদায় শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই বিন্নারি নামক ওই শান্ত গ্রামে এই রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটে। তবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখন পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে সবমিলিয়ে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির সাথে আলাপকালে গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) উক্ত ভয়াবহ হামলা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী বাসিন্দারা জানান, শত শত সশস্ত্র বন্দুকধারী হঠাৎ করেই গ্রামে অতর্কিত প্রবেশ করে এলোপাতাড়িভাবে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। এই আকস্মিক হামলায় পুরো গ্রামজুড়ে মুহূর্তেই চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নিজেদের তাজা প্রাণ বাঁচাতে সাধারণ মানুষ দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চারদিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
হামলার বিভীষিকা বর্ণনা করতে গিয়ে গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা ইসিয়াকু মুসা গণমাধ্যমকে বলেন, “গ্রামের মানুষ তখন জীবন বাঁচাতে দিশেহারা হয়ে চারদিকে কেবল ছুটোছুটি করছিলেন। কিন্তু আসলে কোন দিকে গেলে বা কোথায় আশ্রয় নিলে নিজেদের নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে, তা বুঝতে পারার মতো কোনো উপায় কারো হাতে ছিল না।”
আরেক ভুক্তভোগী বাসিন্দা সাইদু নুহু জানান, বর্বরোচিত হামলা শেষে বন্দুকধারীরা এলাকা ত্যাগ করার পর আতঙ্কিত গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে পুরো গ্রামে অন্তত ২০টির বেশি নিথর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এছাড়া সেই মুহূর্তেও বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী নিখোঁজ ছিলেন বলে জানান তিনি। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া এই হতাহতের হিসাবের সাথে পুলিশের তথ্যের বেশ কিছুটা ফারাক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, গত শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে ঘটনাস্থল থেকে কেবল ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
মোটরসাইকেলে চড়ে এসে হামলা ও ব্যাপক লুটপাট স্থানীয় সম্প্রদায় ও কমিউনিটির সম্মানিত নেতা মালাম আবুবকর সাইফুল্লাহির সুনির্দিষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০টি শক্তিশালী মোটরসাইকেলে চড়ে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রামে প্রবেশ করে। প্রতিটি মোটরসাইকেলে চালকসহ দুজন করে অস্ত্রধারী ব্যক্তি সাওয়ার ছিলেন। জনবসতিপূর্ণ গ্রামে ঢুকে তারা নির্বিচারে সাধারণ মানুষের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন দোকানপাটে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।
সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দোকান থেকে নগদ টাকা-পয়সা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এমনকি হামলার সময় প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সময় আতঙ্কিত বাসিন্দাদের ফেলে যাওয়া বেশ কিছু মোটরসাইককেও হামলাকারীরা লুট করে নিয়ে পালিয়ে যায় বলে জানান ওই কমিউনিটি নেতা।
সশস্ত্র গোষ্ঠীর বেপরোয়া তৎপরতা ও ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র নাইজেরিয়া দীর্ঘকাল ধরেই নানা ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নির্মম সহিংসতার মুখোমুখি হয়ে আসছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে কট্টরপন্থি জিহাদি বিদ্রোহীদের দীর্ঘদিনের তৎপরতা রয়েছে; পাশাপাশি তারাবা রাজ্যসহ দেশের উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় বেপরোয়া অপরাধপ্রবণ সশস্ত্র ডাকাত দলগুলোও সমানভাবে সক্রিয় রয়েছে। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সুদূর গ্রামাঞ্চলে অতর্কিত হামলা চালানো, সাধারণ মানুষকে অপহরণ করা এবং খেটে খাওয়া কৃষক ও খনিশ্রমিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদাবাজি ও অর্থ আদায়ের মতো নানাবিধ গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত।
দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সরকারি প্রশাসনের কার্যকর উপস্থিতি এবং জোরদার নিরাপত্তার অভাব থাকায় এই সশস্ত্র অপরাধী দলগুলোর বেপরোয়া তৎপরতা সফলভাবে দমন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অনেকেরই মূল উদ্দেশ্য আদর্শিক কোনো লড়াই করা নয়, বরং ত্রাস সৃষ্টি করে অবাধ লুটপাট এবং জিম্মি করে মুক্তিপণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নাইজেরিয়া’ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন প্রান্তিক গ্রামীণ জনপদের সাধারণ জনগোষ্ঠীকে বারবার সশস্ত্র আক্রমণ চালানো এসব উগ্র অপরাধী গোষ্ঠীর করুণ হাতের ওপর কার্যত সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। সংস্থাটির জোরালো মতে, অপরাধের সাথে জড়িত সন্দেহভাজন দুর্বৃত্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর বিচারের মুখোমুখি করতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক ব্যর্থতা দিন দিন দেশটিতে সহিংসতা এবং অপরাধীদের দায়মুক্তির প্রবণতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে, গত শনিবার নাইজেরিয়ার সশস্ত্র সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বর্নো রাজ্যে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি বিশেষ বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছেন। সামরিক বাহিনী নিহত এই ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে বোকো হারাম জঙ্গি গোষ্ঠীর সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকেই নাইজেরিয়া সরকার দীর্ঘ সময় ধরে এসব উগ্র জিহাদি সংগঠনের বিরুদ্ধে একটানা সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এর পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে সক্রিয় সশস্ত্র ডাকাত দলগুলোর লাগাতার সহিংসতা সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও অনেক বেশি জটিল ও অবনতিশীল করে তুলেছে। বিন্নারি গ্রামের সর্বশেষ এই মর্মান্তিক হামলা দেশের দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তীব্র শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।























