Dhaka ০৫:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

লক্ষ্মীপুরের অবৈধ ইটভাটা সরাতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে সংসদ সদস্যদের চিঠি

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৩:১৬:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৮ বার দেখা হয়েছে

লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলাজুড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় ৭০টি ইটভাটার ক্ষতিকর কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন ওই অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরা। এর পাশাপাশি সাধারণ কৃষিজমি, স্থানীয় পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং গ্রামীণ অবকাঠামোগত সড়কগুলোর সুরক্ষায় দ্রুততম সময়ে জরুরি ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিকট সুনির্দিষ্ট আবেদন জানিয়েছেন দুই সংসদ সদস্য।

এই বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বরাবর পৃথক দুটি আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রেরণ করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ এবং লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন।

মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এই বিশেষ চিঠিপত্রগুলোতে উভয় সংসদ সদস্য অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা, কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কাটা কঠোর হাতে দমন, এসব কারখানায় অননুমোদিত বিদ্যুৎ সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা, পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নিষিদ্ধ জ্বালানি কাঠ বা উপাদান পোড়ানো পুরোপুরি বন্ধ করা এবং অতিরিক্ত মালামাল বহনকারী ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছেন।

একই সাথে পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের মধ্যকার পারস্পরিক সমন্বয় বজায় রেখে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তাঁরা। জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) গভীর রাতে এই দুই সংসদ সদস্য তাঁদের নিজ নিজ ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে চিঠিগুলো প্রকাশ করেন।

পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে উদ্দেশ্য করে পাঠানো চিঠিতে সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান উল্লেখ করেন যে, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার সিংহভাগ মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। এই জনپদের উর্বর কৃষিজমি মূলত স্থানীয় মানুষের জীবিকা নির্বাহ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু কতিপয় অসাধু ব্যক্তি আইন ও পরিবেশ সংক্রান্ত সকল বিধিবিধান উপেক্ষা করে অবৈধভাবে কৃষিজমির ওপরের অংশের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির কাজে যত্রতত্র ব্যবহার করছেন। এর ফলশ্রুতিতে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা ও ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং সাধারণ কৃষকেরা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এসব অবৈধ ইটভাটার চিমনি থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত কালো ধোঁয়া, চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ধুলাবালি এবং অন্যান্য বিষাক্ত দূষণকারী উপাদান ভয়াবহ মাত্রায় বায়ুদূষণ বৃদ্ধি করছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড যদি নির্বিঘ্নে চলতে থাকে, তবে দেশের কৃষি ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি সরকারের কাঙ্ক্ষিত জলবায়ুসহিষ্ণু টেকসই উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

চিঠিতে গ্রামীণ জনপদের সড়কগুলোর ওপর ভারী যানবাহনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটিও তুলে ধরা হয়। কৃষিজমির বুক চিরে মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়া এবং উৎপাদিত ইট পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক্টর, ট্রলি এবং অন্যান্য ভারী যানবাহন বেপরোয়াভাবে চলাচলের ফলে এলাকার রাস্তাঘাট ভেঙে খানাখন্দ ও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ পথচারী ও এলাকাবাসীর স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাস্তাঘাট রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের বাড়তি আর্থিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এর কারণে প্রতিনিয়ত তীব্র ধুলাবালি ও বিকট শব্দদূষণের পাশাপাশি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অপরদিকে, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন তাঁর লিখিত চিঠিতে রামগতি ও কমলনগর এলাকায় পরিচালিত প্রায় ৭০টি অবৈধ ইটভাটার ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেছেন। এসব ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও মারাত্মক বায়ুদূষণের কারণে স্থানীয় শিশু, বৃদ্ধ ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এই দূষণের শিকার হয়ে গর্ভকালীন জটিলতায় ভোগা নারী, নবজাতক শিশু, বয়োবৃদ্ধ এবং আগে থেকেই শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মানুষেরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এছাড়া ইটভাটার চিমনি থেকে নির্গত তীব্র ধোঁয়া ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ধুলাবালির প্রভাবে স্থানীয় অঞ্চলের বিভিন্ন ফলদ গাছের মুকুল, কচি ফল এবং পরিপক্ব ফল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন তাঁর চিঠিতে অবৈধ ইটভাটাসমূহে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সংযোগ যাচাই করে দ্রুত তা বিচ্ছিন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে এই অবৈধ কাজের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তিনি। তদুপরি, অবৈধ ইটভাটার মাটি ও ইট পরিবহনে স্থানীয় গ্রামীণ সড়কসমূহের অননুমোদিত ব্যবহার এবং অতিরিক্ত মাল বহনকারী ভারী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। মাটি ও ইট বহনে ব্যবহৃত অনিয়ন্ত্রিত ট্রাক্টরের চলাচল বন্ধ করা, ইটভাটায় নিষিদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার রোধ করা এবং দূষণের প্রভাব নিরূপণে পরিবেশগত পরিদর্শন পরিচালনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।

উভয় সংসদ সদস্যই নিজ নিজ চিঠিতে অবৈধ ইটভাটাগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে অবিলম্বে সরেজমিন তদন্ত পরিচালনা, তাদের পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অন্যান্য আইনগত বৈধতা যাচাই এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি, অবৈধ ইটভাটা যেন ভবিষ্যতে পুনরায় চালু হতে না পারে এবং নতুন করে কোনো অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠতে না পারে, সে জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত ও কড়া নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান সংশ্লিষ্ট সকল দফতর ও কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অন্যদিকে, বীথিকা বিনতে হোসাইনও কৃষিজমি, সড়ক, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাঁর উত্থাপিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ জানান।

জানা গেছে, দুই সংসদ সদস্যের পাঠানো এই চিঠির সরকারি অনুলিপি ইতিমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়, লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এবং রামগতি ও কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইনের প্রেরিত চিঠির অনুলিপি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করার দাবিতে এর আগে বিগত ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে একই বিষয় নিয়ে চলতি ২০২৬ সালেও উচ্চ আদালতে আরেকটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। স্থানীয় এলাকাবাসীর তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে আইনি লড়াই ও স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা সত্ত্বেও প্রভাবশালী ইটভাটা মালিকদের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

লক্ষ্মীপুরের অবৈধ ইটভাটা সরাতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে সংসদ সদস্যদের চিঠি

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৩:১৬:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলাজুড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় ৭০টি ইটভাটার ক্ষতিকর কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন ওই অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরা। এর পাশাপাশি সাধারণ কৃষিজমি, স্থানীয় পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং গ্রামীণ অবকাঠামোগত সড়কগুলোর সুরক্ষায় দ্রুততম সময়ে জরুরি ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিকট সুনির্দিষ্ট আবেদন জানিয়েছেন দুই সংসদ সদস্য।

এই বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বরাবর পৃথক দুটি আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রেরণ করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ এবং লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি ও কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন।

মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এই বিশেষ চিঠিপত্রগুলোতে উভয় সংসদ সদস্য অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা, কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কাটা কঠোর হাতে দমন, এসব কারখানায় অননুমোদিত বিদ্যুৎ সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা, পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নিষিদ্ধ জ্বালানি কাঠ বা উপাদান পোড়ানো পুরোপুরি বন্ধ করা এবং অতিরিক্ত মালামাল বহনকারী ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছেন।

একই সাথে পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের মধ্যকার পারস্পরিক সমন্বয় বজায় রেখে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তাঁরা। জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) গভীর রাতে এই দুই সংসদ সদস্য তাঁদের নিজ নিজ ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে চিঠিগুলো প্রকাশ করেন।

পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে উদ্দেশ্য করে পাঠানো চিঠিতে সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান উল্লেখ করেন যে, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার সিংহভাগ মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। এই জনپদের উর্বর কৃষিজমি মূলত স্থানীয় মানুষের জীবিকা নির্বাহ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু কতিপয় অসাধু ব্যক্তি আইন ও পরিবেশ সংক্রান্ত সকল বিধিবিধান উপেক্ষা করে অবৈধভাবে কৃষিজমির ওপরের অংশের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির কাজে যত্রতত্র ব্যবহার করছেন। এর ফলশ্রুতিতে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা ও ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং সাধারণ কৃষকেরা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এসব অবৈধ ইটভাটার চিমনি থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত কালো ধোঁয়া, চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ধুলাবালি এবং অন্যান্য বিষাক্ত দূষণকারী উপাদান ভয়াবহ মাত্রায় বায়ুদূষণ বৃদ্ধি করছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড যদি নির্বিঘ্নে চলতে থাকে, তবে দেশের কৃষি ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি সরকারের কাঙ্ক্ষিত জলবায়ুসহিষ্ণু টেকসই উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।

চিঠিতে গ্রামীণ জনপদের সড়কগুলোর ওপর ভারী যানবাহনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটিও তুলে ধরা হয়। কৃষিজমির বুক চিরে মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়া এবং উৎপাদিত ইট পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক্টর, ট্রলি এবং অন্যান্য ভারী যানবাহন বেপরোয়াভাবে চলাচলের ফলে এলাকার রাস্তাঘাট ভেঙে খানাখন্দ ও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ পথচারী ও এলাকাবাসীর স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাস্তাঘাট রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের বাড়তি আর্থিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এর কারণে প্রতিনিয়ত তীব্র ধুলাবালি ও বিকট শব্দদূষণের পাশাপাশি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অপরদিকে, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন তাঁর লিখিত চিঠিতে রামগতি ও কমলনগর এলাকায় পরিচালিত প্রায় ৭০টি অবৈধ ইটভাটার ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেছেন। এসব ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও মারাত্মক বায়ুদূষণের কারণে স্থানীয় শিশু, বৃদ্ধ ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এই দূষণের শিকার হয়ে গর্ভকালীন জটিলতায় ভোগা নারী, নবজাতক শিশু, বয়োবৃদ্ধ এবং আগে থেকেই শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মানুষেরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এছাড়া ইটভাটার চিমনি থেকে নির্গত তীব্র ধোঁয়া ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ধুলাবালির প্রভাবে স্থানীয় অঞ্চলের বিভিন্ন ফলদ গাছের মুকুল, কচি ফল এবং পরিপক্ব ফল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন তাঁর চিঠিতে অবৈধ ইটভাটাসমূহে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সংযোগ যাচাই করে দ্রুত তা বিচ্ছিন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে এই অবৈধ কাজের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তিনি। তদুপরি, অবৈধ ইটভাটার মাটি ও ইট পরিবহনে স্থানীয় গ্রামীণ সড়কসমূহের অননুমোদিত ব্যবহার এবং অতিরিক্ত মাল বহনকারী ভারী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। মাটি ও ইট বহনে ব্যবহৃত অনিয়ন্ত্রিত ট্রাক্টরের চলাচল বন্ধ করা, ইটভাটায় নিষিদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার রোধ করা এবং দূষণের প্রভাব নিরূপণে পরিবেশগত পরিদর্শন পরিচালনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।

উভয় সংসদ সদস্যই নিজ নিজ চিঠিতে অবৈধ ইটভাটাগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করে অবিলম্বে সরেজমিন তদন্ত পরিচালনা, তাদের পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অন্যান্য আইনগত বৈধতা যাচাই এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি, অবৈধ ইটভাটা যেন ভবিষ্যতে পুনরায় চালু হতে না পারে এবং নতুন করে কোনো অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠতে না পারে, সে জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত ও কড়া নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান সংশ্লিষ্ট সকল দফতর ও কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। অন্যদিকে, বীথিকা বিনতে হোসাইনও কৃষিজমি, সড়ক, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাঁর উত্থাপিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ জানান।

জানা গেছে, দুই সংসদ সদস্যের পাঠানো এই চিঠির সরকারি অনুলিপি ইতিমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়, লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এবং রামগতি ও কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইনের প্রেরিত চিঠির অনুলিপি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করার দাবিতে এর আগে বিগত ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়েছিল। পরবর্তীতে একই বিষয় নিয়ে চলতি ২০২৬ সালেও উচ্চ আদালতে আরেকটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। স্থানীয় এলাকাবাসীর তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে আইনি লড়াই ও স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা সত্ত্বেও প্রভাবশালী ইটভাটা মালিকদের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।