নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোরআন শরিফে শপথ নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন জোহরান মামদানি। বৃহস্পতিবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহরটির মেয়র হিসেবে শপথ নেন। তিনি একই সঙ্গে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র।
শপথ অনুষ্ঠানে মামদানি ব্যবহার করেন তাঁর দাদার ব্যক্তিগত কোরআন শরিফ এবং নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি থেকে ধার নেওয়া প্রায় ২০০ বছর পুরোনো একটি ঐতিহাসিক কোরআন। টাইমস স্কয়ারের নিচে পরিত্যক্ত একটি সাবওয়ে স্টেশনে আয়োজিত ব্যক্তিগত শপথ অনুষ্ঠানে এই কোরআন দুটি ব্যবহৃত হয়। শুক্রবার নিউইয়র্ক সিটি হলে দিনের বেলার আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর দাদা ও দাদির মালিকানাধীন দুটি কোরআন শরিফ ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছেন।
লাইব্রেরি থেকে নেওয়া ঐতিহাসিক কোরআনটি একসময় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ ও লেখক আর্তুরো শোমবার্গের মালিকানায় ছিল। শোমবার্গ ১৯২৬ সালে তাঁর প্রায় চার হাজার বইয়ের সংগ্রহ নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির কাছে বিক্রি করেন, যা পরবর্তীতে শোমবার্গ সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ব্ল্যাক কালচারের ভিত্তি গড়ে তোলে।
শোমবার্গ উনিশ শতকের সত্তরের দশকে পুয়ের্তো রিকোতে জন্মগ্রহণ করেন। পরে তিনি নিউইয়র্কে অভিবাসী হিসেবে বসবাস শুরু করেন এবং ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকের হার্লেম রেনেসাঁ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা নিউইয়র্কের কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি জানিয়েছে, এই কোরআনটি আকারে ছোট এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী হওয়ায় এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কালো ও লাল কালি দিয়ে লেখা এই কোরআনটির নির্দিষ্ট তারিখ বা স্বাক্ষর না থাকলেও এর লিপি ও বাঁধাই দেখে ধারণা করা হয়, এটি উনিশ শতকে অটোমান সিরিয়ায় তৈরি।
লাইব্রেরির মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামি অধ্যয়ন বিভাগের কিউরেটর হিবা আবিদ বলেন, এই কোরআনের গুরুত্ব শুধু এর সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যুক্ত একটি ধর্মগ্রন্থ, যা দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক লাইব্রেরি ব্যবস্থার অংশ।
লাইব্রেরির সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যান্থনি ডব্লিউ মার্কস বলেন, এই কোরআন বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্তি, প্রতিনিধিত্ব ও নাগরিক মূল্যবোধের এক গভীর প্রতীক।
নিউইয়র্কে মেয়রদের জন্য ধর্মগ্রন্থে শপথ নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তবে অতীতে অনেক মেয়র বাইবেল ব্যবহার করেছেন। সাবেক মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ এক অনুষ্ঠানে পারিবারিক বাইবেল ব্যবহার করেছিলেন এবং বিল ডি ব্লাসিও ব্যবহার করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের বাইবেল। মামদানির পূর্বসূরি এরিক অ্যাডামসও পারিবারিক বাইবেলে শপথ নিয়েছিলেন।
প্রচারণার সময় মামদানির ধর্মীয় পরিচয় ও উগান্ডায় জন্ম নেওয়া দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান পরিচয় বিশেষভাবে আলোচনায় ছিল। তাঁর প্রচারণায় নিউইয়র্কের বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিওতে তিনি ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধির বিষয়েও খোলাখুলি কথা বলেন।
ইসরায়েলের নীতির কড়া সমালোচক মামদানি গাজায় চলমান যুদ্ধের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন। এ কারণে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে কটাক্ষ ও আক্রমণ করেছেন। তবে প্রচারণার সময় মামদানি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি কখনোই নিজের পরিচয় বা বিশ্বাস লুকাবেন না।
এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, আমি কে, কীভাবে জীবনযাপন করি কিংবা যে বিশ্বাসে আমি গর্বিত—তা বদলাব না। আমি আর নিজেকে আড়ালে রাখব না, আমি নিজেকে আলোর মধ্যেই খুঁজে নেব।
















