ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই ভূখণ্ডে প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ ধর্মীয় স্বাধীনতাসহ সমঅধিকার সুনিশ্চিত করতে বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় ও প্রতিষ্ঠানের মতো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন মঠ-মন্দির পরিচালনা, নতুন সংস্কার ও সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে রাষ্ট্র নিয়মিত আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করছে। সনাতন ধর্মের পুরোহিতদের মাসিক সম্মানী প্রথা চালুর পাশাপাশি হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের নানামুখী কল্যাণমূলক কার্যক্রমকে গতিশীল করা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুদান সুষ্ঠুভাবে বণ্টনে আরও সমন্বিত ভূমিকা পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘শারদীয় দুর্গোৎসব’ উপলক্ষে প্রদত্ত এক বিশেষ বাণীতে দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এসব অভিমত প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রীয় এই বাণীতে তিনি দেশের ভেতরে ও প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশের সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে শারদীয় দুর্গোৎসবের আন্তরিক অভিনন্দন ও গভীর শুভেচ্ছা জানান।
বাণীতে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, দুর্গোৎসব হলো বাংলাভাষী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান। শরতের ঝকঝকে নির্মল আকাশ, শুভ্র কাশের মেলা আর আনন্দঘন পরিবেশের মাঝে প্রতি বছর দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ভক্তকুলের মনে নতুন স্বপ্ন, কল্যাণ ও আশার আলো জাগিয়ে তোলে। শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল বার্তা হলো সমাজের সকল অশুভ ও আসুরিক শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের জয়গাথা রচনা করা। অন্যায়-অসত্য ও অমানবিকতার বিপরীতে সত্য ও মানবতার জয়গান গাওয়াই এই উৎসবের মূল দর্শন।
রাষ্ট্রপতি আরও যুক্ত করেন, এই দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিকেরা আবহমান কাল ধরেই অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছেন, যা আমাদের জাতিগত সম্প্রীতির এক অপূর্ব ও উজ্জ্বল নিদর্শন। দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মের অনুসারীদের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমিত নয়; বরং এর সাথে মিশে আছে চিরন্তন বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি ও হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য। এই আনন্দের ক্ষণে সমাজের সকল স্তরের ও শ্রেণি-পেশার মানুষ পারস্পরিক সৌহার্দ্যের সুতোয় বাঁধা পড়েন। সাধারণ মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সহমর্মিতা এক নতুন রূপ লাভ করে। দুর্গোৎসবের সত্য ও সুন্দরের এই আলো সারা সমাজে ছড়িয়ে পড়ুক এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যকার বন্ধুত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হোক—এমনটাই প্রত্যাশা।
তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বী নাগরিকেরা সহ আমাদের দেশের সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে, মুক্তভাবে, নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশে নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়ম-নীতি পালন করতে পারেন—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল দফতর ও ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাণীতে রাষ্ট্রপতি স্মরণ করিয়ে দেন যে, জগতের প্রতিটি ধর্মই মানুষকে পরম সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মসংযম ও মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার মূল পাঠ দান করে। অশুভ ও অন্যায়ের পথ থেকে মুক্ত করে শুভ ও শান্তির বার্তা দেয়। কাজেই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন যথাযথভাবে মেনে চলি এবং মানবসেবায় নিজেদের উৎসর্গ করি। ধর্ম, বর্ণ কিংবা কোনো গোষ্ঠীগত পরিচয়ের অজুহাতে যাতে দেশের কোনো একক নাগরিকও বৈষম্য, বঞ্চনা কিংবা সুরক্ষাহীনতার মুখে না পড়েন—তা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, তেমনি আমাদের সকলের সামাজিক দায়িত্ব। শারদীয় দুর্গোৎসবের অনাবিল আনন্দ যেন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, নিঃস্ব ও সাধারণ মানুষের মাঝেও সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে—সেই আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
পরিশেষে রাষ্ট্রপ্রধান আশাবাদ ব্যক্ত করেন, শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন সম্প্রদায়ের সকলের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে অনাবিল সুখ, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি বয়ে আনুক। সকল ভেদাভেদ মুছে গিয়ে সত্য, ইনসাফ ও কল্যাণের অমিয় বার্তা প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক। বাণীতে তিনি শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে গৃহীত সমস্ত আয়োজনের সার্বিক সফলতা কামনা করেন।






















