সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে দেশের প্রত্যেক মানুষের প্রাপ্য সুনির্দিষ্ট অধিকার ও সুদৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি নিজের অর্পিত দায়িত্ব ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সার্বিক কল্যাণে ক্ষমতার মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
আজ সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকা-১৭ আসনের হিন্দু সম্প্রদায়ের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই বৈঠকের বিশদ বিবরণ প্রদান করেন।
হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধর্মের পার্থক্য বা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকটি মানুষের প্রাপ্য মৌলিক অধিকার ও সঠিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সর্বাত্মক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে আমাদের সরকার। নাগরিক হিসেবে একজন মানুষের যে আইনি ও মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা অক্ষুণ্ন রাখা এবং নিশ্চিত করাই একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রধান কর্তব্য।’ তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনার যা ন্যায়সঙ্গত পাওনা এবং সরকারের প্রধান হিসেবে আমার যা পবিত্র কর্তব্য, আমি মূলত সেটিই সততার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করছি। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে নিজের দায়িত্ববোধ ও সুগভীর দায়বদ্ধতা থেকেই আমি সর্বদা সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখব।’
উক্ত সাক্ষাতকালে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজায় স্থানীয় পূজামণ্ডপগুলো সরজমিনে পরিদর্শনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত ৮টি সুপরিচিত পূজা মণ্ডপ ও সার্বজনীন পূজা কমিটির প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কল্যাণ ও সুরক্ষায় বিএনপি সমর্থিত সরকারের নেওয়া একাধিক গঠনমূলক পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন উপস্থিত নেতৃবৃন্দ। বিশেষ করে আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বৃদ্ধি করা এবং পূজামণ্ডপগুলোর জন্য বিশেষ আর্থিক অনুদান আগের চেয়ে বড় পরিসরে বাড়িয়ে দেওয়ায় তারা প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা নিজেরাই অকপটে বলেছেন যে, এই স্বল্প সময়ের মেয়াদে যতটুকু উন্নয়ন ও সহযোগিতা করা সম্ভব, আমরা তা আন্তরিকভাবে করেছি। আরও কিছু বিষয়ে সমাধান আনার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই দ্রুত পদক্ষেপগুলো থেকেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, দেশের মানুষের কল্যাণে সরকারের আন্তরিক সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই।’
মতবিনিময় সভায় দেশের বিভিন্ন সময়ের ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তাঁর পিতা মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সেই রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন। ঠিক একইভাবে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানেও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘জাতির সংকটাপন্ন ও ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে যখন আমরা কখনো ধর্মকে আলাদা বিবেচনার বিষয় বানাইনি, তখন অন্যান্য সামাজিক ও জাতীয় কর্মকাণ্ডে কেন ধর্মকে বিবেচনায় আনব? আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছি এবং দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও সবাই সমভাবে অংশগ্রহণ করেছি।’
আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ধর্মের নেতাকর্মীদের ওপর পরিচালিত অমানবিক নির্যাতনের কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেই দুঃসময়ে আন্দোলন করতে গিয়ে দলের মুসলিম নেতাকর্মীরা যেভাবে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ঠিক একইভাবে হিন্দু নেতাকর্মীরাও সমপরিমাণ বর্বরোচিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; সেখানে কোনো ধর্মীয় পার্থক্য করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা আমাকে দেশের সেবা করার একটি সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছেন। আমি আমার অবস্থান ও সামর্থ্য থেকে চেষ্টা করব, ধর্মীয় পরিচয়ের দিক থেকে নয়, বরং মানুষ হিসেবে প্রত্যেক নাগরিককে আমার প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্যে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে।’
উক্ত মতবিনিময় সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট নেতৃবর্গের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রমেশ দত্ত, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সভাপতি অলক সাহা, বারিধারা ডিওএইচএস পূজা কমিটির সভাপতি জীবন কানাই দাস, ব্রিটিশ চন্দ্র কর্মকার, নারায়ন চন্দ্র সাহা, প্রদীপ চন্দ্র দাস, শিখা রানী দাস, শ্যামল কুমার দাস ও রাজিব কুমার আচার্যসহ অনেকে। এ ছাড়া ঢাকা-১৭ আসনে সংসদ সদস্য তারেক রহমানের স্থানীয় প্রতিনিধি আব্দুর রহমান সানি এবং বনানী সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ সফিকুজ্জামান রতন সভায় উপস্থিত ছিলেন।






















