ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের ইতিহাসে প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের পর্যায়ের বৈঠক। তবে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্কের বিভিন্ন টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সশরীরে অংশ নিচ্ছেন না বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ বাদে জোটের বাকি ছয়টি সদস্যদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা এই বৈঠকে সরাসরি যোগ দিচ্ছেন।
ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিমসটেক সদস্যদেশগুলোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ ও শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো এই বৈঠকে যৌথ আলোচনায় বসবেন। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দিল্লি সফরে না যাওয়ার বিষয়ে সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও যাননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যদিও বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তাকে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল যে সেই আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ৬ জুন ব্যাংকক ঘোষণার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রধান লক্ষ্য নিয়ে বিমসটেকের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই জোটের সাতটি সদস্যদেশ হলো বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান এবং এর স্থায়ী সচিবালয় রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত। গত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে সরাসরি অংশ না নেওয়ার বিষয়টি গত ৪ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিমসটেক সচিবালয়ের মধ্যে আদান-প্রদান করা আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র থেকেও স্পষ্ট হয়। ওইদিন বিমসটেক সচিবালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে ১২ ও ১৩ অক্টোবরের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের জন্য চার সদস্যের একটি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নাম ও পরিচয় জানানো হয়, যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম রাখা হয়নি। প্রেরিত চিঠি অনুযায়ী, এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। অন্যদিকে, ৫ অক্টোবর সদস্যদেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বিমসটেক সচিবালয়ের এক জরুরি চিঠিতে জানানো হয় যে, ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এবং ৫ অক্টোবরের মধ্যে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা তাদের প্রতিনিধিদলের মনোনয়ন পাঠিয়েছে, আর বাকি তিন দেশ মিয়ানমার, নেপাল ও থাইল্যান্ডকে দ্রুত তাদের প্রতিনিধিদের নাম পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
দিল্লির এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন স্বাগতিক ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এর আগের দিন জ্যেষ্ঠ ও সচিব পর্যায়ের বৈঠক পরিচালনা করবেন ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন। সম্মেলনে ভুটানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুংতেন দর্জি, মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল কো কো ও, নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং, শ্রীলঙ্কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দনা আবেরত্নে এবং থাইল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসাক থংস্রি সশরীরে অংশ নেবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নয়াদিল্লির এই বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সন্ত্রাসবাদ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ দৃঢ়ভাবে মোকাবিলার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। এছাড়া মানব পাচার, মাদক পাচার, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। গত ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের সন্ত্রাসবাদ দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধবিষয়ক যৌথ কার্যকরী দলের একাদশ বৈঠকের সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলোও এবারের মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।
উল্লেখ্য, বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠকটি আয়োজনের প্রথম ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালে। ওই বছরের ৩০ ও ৩১ আগস্ট নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত জোটের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে সদস্যদেশগুলোর শীর্ষ নেতারা নিয়মিতভাবে এই বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে একমত পোষণ করেছিলেন। কাঠমান্ডু ঘোষণায় সদস্যদেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছিল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘ দেড় যুগ পর অবশেষে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের ২০তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক আয়োজনের আনুষ্ঠানিক ধারণাপত্র অনুমোদন করা হয়, যার প্রায় দেড় বছর পর আজ নয়াদিল্লিতে প্রথমবারের মতো এই বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।






















