পাবনার ফরিদপুর উপজেলায় জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক এবং ভেজাল উপকরণ ব্যবহার করে নকল দুধ উৎপাদনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ ছদ্মবেশে ও অভিনব কৌশলে পরিচালিত এক সাঁড়াশি অভিযানে ভেজাল দুধ তৈরির দুটি অবৈধ কারখানার সন্ধান মেলে। এই অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার দায়ে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, একটি কারখানা সাময়িকভাবে সিলগালা এবং সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তিকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। গত শনিবার (১০ অক্টোবর ২০২৬) জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাবনা জেলা কার্যালয় এবং ফরিদপুর উপজেলা প্রশাসনের যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগে এই সফল অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযান সূত্রে বিস্তারিত জানা যায় যে, ফরিদপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র দুধের নামে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভেজাল খাদ্যপণ্য তৈরি এবং বাজারজাত করে আসছে—এমন গোপন ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অপরাধীদের হাতেনাতে পাকড়াও করতে সম্পূর্ণ কৌশলগত উপায়ে অভিযান পরিচালনার রূপরেখা তৈরি করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অপরাধীদের কোনো ধরনের সতর্ক হওয়ার সুযোগ না দিয়ে বিকেল ৩টা থেকে সম্পূর্ণ ছদ্মবেশে বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা ও স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার আড়ালে ওই এলাকায় পজিশন নিয়ে নিবিড় নজরদারি শুরু করেন। পরবর্তীতে সন্ধ্যার দিকে যখন ওই কারখানাগুলোতে ভেজাল দুধ উৎপাদনের অপতৎপরতা শুরু হয়, তখনই কর্মকর্তারা সেখানে প্রবেশ করে অনিয়মের হাতেকলমে সত্যতা পান।
অভিযানের প্রাথমিক পর্যায়ে উপজেলার পুরেন্দরপুর উত্তরপাড়া এলাকার শামীম হোসেনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে দুধে অত্যন্ত মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মেশানোর অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ গ্রাম হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড জব্দ করা হয়। মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে দুধে ভেজাল দেওয়ার অপরাধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪২ ধারার বিধান অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানের মালিককে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অন্যদিকে, একই উপজেলার স্বপ্ন ডেইরি ফার্ম নামের অপর একটি কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে আরও ভয়াবহ চিত্র দেখতে পান কর্মকর্তারা। সেখানে জেলি, সয়াবিন তেল এবং পামওয়েলসহ বিভিন্ন কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নকল ও ভেজাল দুধ প্রস্তুত করা হচ্ছিল। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক অত্যন্ত সুকৌশলে বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা ও স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রমের সুযোগ নিয়ে ওই কারখানার ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে জেলি, সয়াবিন তেল এবং দুধ তৈরির কাজে ব্যবহৃত ভারী ব্লেন্ড মেশিন দেখতে পান।
ঘটনার তাৎপর্যের বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গেই ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হলে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন এবং আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। নকল দুধ উৎপাদনের অপরাধে স্বপ্ন ডেইরি ফার্মকে আরও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং সংশ্লিষ্ট এক কারখানার মালিক বা প্রতিনিধিকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কারখানাটি সাময়িকভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয়। এ সময় কারখানায় মজুত থাকা ভেজাল উৎপাদনে ব্যবহৃত দুই ড্রাম জেলি ও এক ড্রাম পামওয়েল জনসমক্ষে ধ্বংস করা হয়। পুরো অভিযান পরিচালনা কালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের একটি চৌকস দল এবং র্যাব-১২-এর সদস্যরা সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থেকে সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, দুধ বা অন্য যেকোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো, নকল পণ্য উৎপাদন করা কিংবা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ নিম্নমানের খাদ্য বাজারজাত করা একটি গুরুতর ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য কঠোর আইনি ধারায় বড় অঙ্কের জরিমানা, প্রতিষ্ঠান সিলগালাসহ কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে। সাধারণ ভোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যে, ভেজাল খাদ্য উৎপাদন বা বাজারজাতকরণের কোনো ধরনের তথ্য পেলে তা যেন অবিলম্বে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিকটস্থ কার্যালয় অথবা সরাসরি জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ১৬১২ইনম্বরে ফোন করে জানানো হয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিরাপদ রাখা এবং ভোক্তাদের মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে ভেজাল, নকল ও অনিরাপদ খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী এই নিয়মিত তদারকি ও সাঁড়াশি অভিযান ভবিষ্যতেও অবিরাম অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

























