Dhaka ১১:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি ছাড়ানোর আশঙ্কা

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:৪৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৫ বার দেখা হয়েছে

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রতি মাসেই চার থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা করে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এই তিন মাসের ব্যবধানে সংস্থাটির মোট তহবিল ঘাটতি ইতিমধ্যেই ১৩ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করেছে। বর্তমান জ্বালানি বাজার ও উৎপাদন খরচের এই অব্যাহত ধারা যদি বছরের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে হিসাব অনুযায়ী বছর শেষে সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এই বিশাল অংকের লোকসান ও তহবিল ঘাটতি পূরণের জন্য সম্পূর্ণ দায় সরকারকেই ভর্তুকি হিসেবে পরিশোধ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপিডিবির ক্রমবর্ধমান লোকসান ও তহবিল ঘাটতির চাপ কিছুটা হ্রাস করার মহৎ উদ্দেশ্যে সরকার গত জুনেই খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিপিডিবির আর্থিক অবস্থার কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি; বরং দিন দিন সংস্থাটির তহবিল ঘাটতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে চলেছে। বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত ও কার্যকর উন্নতি না হলে আসন্ন সেচ মৌসুম এবং পরবর্তীতে গ্রীষ্মকালীন সময়ে বিদ্যুতের যখন সর্বোচ্চ চাহিদা তৈরি হবে, তখন এই ঘাটতি আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি বাবদ মোট ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেই নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী অর্থ বিভাগ গত তিন মাসে বিপিডিবিকে গড়ে তিন হাজার কোটি টাকা করে মোট ৯ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে। তবে সার্বিক লোকসান ও বর্তমান তহবিল ঘাটতির বাস্তব চিত্র বিবেচনা করে বিপিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের মোট ভর্তুকি ব্যয় বাজেটের নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় অন্তত ১৪ হাজার কোটি টাকা বেশি হতে পারে।

বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি বাবদ ব্যয় ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। বিপিডিবির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার সংস্থাটিকে ৭ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের মধ্যে সেই ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১২ হাজার ৮০০ কোটি টাকায়। তবে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে জ্বালানি সংকটের কারণে তা এক ধাক্কায় বৃদ্ধি পেয়ে ২৯ হাজার ৫১১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এরপরের অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৩৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ভর্তুকির রেকর্ড পরিমাণ দাঁড়ায় ৬২ হাজার কোটি টাকায়। সর্বশেষ গত অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে বিপিডিবি ৪৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পেয়েছিল, যা এবার ৫০ হাজার কোটি টাকার নতুন রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই সার্বিক বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হলে বিপিডিবির সদস্য (অর্থ) অঞ্জনা খান মজলিশ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিডিবির হিসাব ও অর্থ শাখার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় বাধ্য হয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে, যা মূলত ফার্নেস অয়েলকেন্দ্রিক। এর ফলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে যে ধারায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে তবে বছর শেষে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা নিশ্চিতভাবেই ছাড়িয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার ঠিক আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ৭০ টাকা ১০ পয়সা। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা কয়েক দফায় বৃদ্ধি পেয়ে গত মে মাসে প্রতি লিটার ১১৩ টাকা ৫৪ পয়সায় দাঁড়ায়। একই সময়ে অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্যও যথেষ্ট ঊর্ধ্বমুখী হয়। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে সরকার গত জুনে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গড়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অফ বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত এই মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে ফার্নেস অয়েল বা জ্বালানি তেল পুড়িয়ে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেশি। বিপিডিবির ৫ অক্টোবরের উৎপাদন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৬৯৯ মেগাওয়াট। সেই সময়ে কেবল গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৪ হাজার ৮৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্রায় সমপরিমাণ অর্থাৎ ৪ হাজার ১৯৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা (প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী)। অর্থাৎ তেলভিত্তিক উৎপাদনে খরচ যে কতটা ভয়াবহ মাত্রায় বেশি, তা এই তুলনামূলক হিসাব থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামছুল আলম এ বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করে গণমাধ্যমকে জানান যে, বিগত দিনগুলোর মতো আজও কোনো ধরনের গভীর বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে, যার ফলে ভর্তুকির পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, কীভাবে বারবার বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানো যায়, সরকারকে এখন সেই দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান যে, গত কয়েক মাস ধরে পর্যাপ্ত গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়েই ফার্নেস অয়েল-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে হয়েছে। দেশের বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে নিয়মিত বিঘ্ন ঘটায় অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, পিক আওয়ার বা সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে আমাদের প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে নিতে হচ্ছে, যা গত বুধবার রাতে বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক অতীতে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে এত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রহণের প্রয়োজন কখনো পড়েনি। যদিও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ সবচেয়ে বেশি, তবুও বাধ্য হয়ে তা করতে হওয়ায় সামগ্রিকভাবে বিপিডিবির ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জুন-জুলাই মাসে ফার্নেস অয়েলের গড় দাম ছিল প্রতি লিটার ১০০ টাকা ৩৯ পয়সা, যা গত ৩০ সেপ্টেম্বর আরও বেড়ে প্রতি লিটার ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সায় দাঁড়ায়। বিইআরসি কর্তৃক বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় হিসাব করা হয়েছিল যে এতে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কমবে, কিন্তু জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে সেই হিসাব মেলেনি। বর্তমানে আমদানিসহ দেশের বিদ্যুতের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট, যার মধ্যে কেবল গ্যাসচালিত কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ২৫২ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৫৪টি কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি ছাড়ানোর আশঙ্কা

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:৪৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রতি মাসেই চার থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা করে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এই তিন মাসের ব্যবধানে সংস্থাটির মোট তহবিল ঘাটতি ইতিমধ্যেই ১৩ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করেছে। বর্তমান জ্বালানি বাজার ও উৎপাদন খরচের এই অব্যাহত ধারা যদি বছরের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে হিসাব অনুযায়ী বছর শেষে সংস্থাটির মোট লোকসানের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এই বিশাল অংকের লোকসান ও তহবিল ঘাটতি পূরণের জন্য সম্পূর্ণ দায় সরকারকেই ভর্তুকি হিসেবে পরিশোধ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপিডিবির ক্রমবর্ধমান লোকসান ও তহবিল ঘাটতির চাপ কিছুটা হ্রাস করার মহৎ উদ্দেশ্যে সরকার গত জুনেই খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিপিডিবির আর্থিক অবস্থার কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি; বরং দিন দিন সংস্থাটির তহবিল ঘাটতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে চলেছে। বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত ও কার্যকর উন্নতি না হলে আসন্ন সেচ মৌসুম এবং পরবর্তীতে গ্রীষ্মকালীন সময়ে বিদ্যুতের যখন সর্বোচ্চ চাহিদা তৈরি হবে, তখন এই ঘাটতি আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি বাবদ মোট ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সেই নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী অর্থ বিভাগ গত তিন মাসে বিপিডিবিকে গড়ে তিন হাজার কোটি টাকা করে মোট ৯ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে। তবে সার্বিক লোকসান ও বর্তমান তহবিল ঘাটতির বাস্তব চিত্র বিবেচনা করে বিপিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের মোট ভর্তুকি ব্যয় বাজেটের নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় অন্তত ১৪ হাজার কোটি টাকা বেশি হতে পারে।

বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি বাবদ ব্যয় ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। বিপিডিবির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার সংস্থাটিকে ৭ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের মধ্যে সেই ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১২ হাজার ৮০০ কোটি টাকায়। তবে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে জ্বালানি সংকটের কারণে তা এক ধাক্কায় বৃদ্ধি পেয়ে ২৯ হাজার ৫১১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এরপরের অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৩৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ভর্তুকির রেকর্ড পরিমাণ দাঁড়ায় ৬২ হাজার কোটি টাকায়। সর্বশেষ গত অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে বিপিডিবি ৪৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পেয়েছিল, যা এবার ৫০ হাজার কোটি টাকার নতুন রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই সার্বিক বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হলে বিপিডিবির সদস্য (অর্থ) অঞ্জনা খান মজলিশ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিডিবির হিসাব ও অর্থ শাখার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় বাধ্য হয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে, যা মূলত ফার্নেস অয়েলকেন্দ্রিক। এর ফলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে যে ধারায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে তবে বছর শেষে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা নিশ্চিতভাবেই ছাড়িয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার ঠিক আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ৭০ টাকা ১০ পয়সা। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা কয়েক দফায় বৃদ্ধি পেয়ে গত মে মাসে প্রতি লিটার ১১৩ টাকা ৫৪ পয়সায় দাঁড়ায়। একই সময়ে অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্যও যথেষ্ট ঊর্ধ্বমুখী হয়। এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে সরকার গত জুনে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি করে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গড়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অফ বাংলাদেশের (পিজিসিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত এই মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে ফার্নেস অয়েল বা জ্বালানি তেল পুড়িয়ে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেশি। বিপিডিবির ৫ অক্টোবরের উৎপাদন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৬৯৯ মেগাওয়াট। সেই সময়ে কেবল গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে ৪ হাজার ৮৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্রায় সমপরিমাণ অর্থাৎ ৪ হাজার ১৯৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা (প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী)। অর্থাৎ তেলভিত্তিক উৎপাদনে খরচ যে কতটা ভয়াবহ মাত্রায় বেশি, তা এই তুলনামূলক হিসাব থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামছুল আলম এ বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করে গণমাধ্যমকে জানান যে, বিগত দিনগুলোর মতো আজও কোনো ধরনের গভীর বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে, যার ফলে ভর্তুকির পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, কীভাবে বারবার বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানো যায়, সরকারকে এখন সেই দূরদর্শী ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান যে, গত কয়েক মাস ধরে পর্যাপ্ত গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়েই ফার্নেস অয়েল-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়াতে হয়েছে। দেশের বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে নিয়মিত বিঘ্ন ঘটায় অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, পিক আওয়ার বা সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে আমাদের প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে নিতে হচ্ছে, যা গত বুধবার রাতে বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক অতীতে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে এত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রহণের প্রয়োজন কখনো পড়েনি। যদিও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ সবচেয়ে বেশি, তবুও বাধ্য হয়ে তা করতে হওয়ায় সামগ্রিকভাবে বিপিডিবির ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জুন-জুলাই মাসে ফার্নেস অয়েলের গড় দাম ছিল প্রতি লিটার ১০০ টাকা ৩৯ পয়সা, যা গত ৩০ সেপ্টেম্বর আরও বেড়ে প্রতি লিটার ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সায় দাঁড়ায়। বিইআরসি কর্তৃক বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় হিসাব করা হয়েছিল যে এতে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা কমবে, কিন্তু জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে সেই হিসাব মেলেনি। বর্তমানে আমদানিসহ দেশের বিদ্যুতের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট, যার মধ্যে কেবল গ্যাসচালিত কেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ২৫২ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৫৪টি কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট।