দেশে এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যেখানে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জনগণের সেবা করবে। শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনব্যাপী এই বৈশ্বিক সম্মেলনের আয়োজন করে।
উদ্বোধনী ভাষণে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূলনীতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের দেশগুলোকে একত্রিত করেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সুদৃঢ় যোগাযোগ এই অঞ্চলকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ সবসময় গঠনমূলক আলোচনা, কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের নীতিতে বিশ্বাসী। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে। তিনি আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ তার সব আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে; কারণ শান্তি ও প্রীতিই যে অভিন্ন প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি—তা বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বঙ্গোপসাগর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে আসছে। বাংলাদেশের চমৎকার কৌশলগত অবস্থানের কারণে দেশের নদীবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং উপকূলীয় অর্থনীতি সহজেই বৃহত্তর বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে। এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল (শিপিং), মৎস্যচাষ, পর্যটন, জ্বালানি খাত এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (সাপ্লাই চেইন) বিশাল সুযোগ লুকিয়ে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের এই অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে যৌথ ও টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত করা উচিত। এর জন্য প্রয়োজন আরও গভীর ও সুদৃঢ় দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক। বাংলাদেশ ও আঞ্চলিক অংশীদাররা মিলে বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় পারস্পরিক সহযোগিতা আরও প্রসারণ করতে পারে। এর মাধ্যমে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজার উন্মুক্ত হবে এবং উদীয়মান তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। সাম্য, ন্যায়বিচার এবং সততার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী সহযোগিতার অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও তিনি জোর দেন।
উন্নয়ন ও সুশাসনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে তাঁর সরকার সরকারি ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করতে কাজ করছে। যেকোনো মূল্যে নাগরিকদের মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নীতি এবং স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। দেশের আইনের শাসন প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করার অঙ্গিকার করে তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করবো, যেখানে সরকারী প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের জনগণের সেবা করবে।”
বক্তব্যের শেষভাগে আন্তর্জাতিক মানবিক দায়িত্ব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকট নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে একটি বড় বৈশ্বিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে, যেখানে দেশটি প্রায় ১৩ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হলো এসব রোহিঙ্গা নাগরিকদের দ্রুত, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই উপায়ে নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। তবে এই কঠিন লক্ষ্য অর্জনের জন্য টেকসই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং বিশ্বব্যাপী পর্যাপ্ত অর্থায়ন অপরিহার্য। রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ সমাধানের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের উৎস যা মিয়ানমারে শুরু হয়েছিল, তার সমাধানও অবশ্যই মিয়ানমারে শেষ হতে হবে।






















