দুই দশক আগেও যেখানে ছিল মাত্র দুটো নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, সেই চীন আজ বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশ লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল। কীভাবে এই বিস্ময় জন্ম নিলো, কীভাবে এক নবীন শিল্প উঠে দাঁড়ালো বিশ্বের নেতৃত্বে—তার গল্প যেন এক দীর্ঘ, শান্ত অথচ তীব্র যাত্রাপথ।
২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে সাদা নীল সবুজে মোড়া বৈদ্যুতিক বাসগুলো যখন শহরের রাস্তায় ছুটছিল, তখন কেউই ভাবেনি যে এ পথ এত দূর যাবে। মাত্র পঞ্চাশটি বাসের সেই স্বপ্নময় শুরু আসলে চীনের ইভি যুগের প্রথম আলোকরেখা। অলিম্পিক জয়ের ঠিক পর থেকেই দেশটি বুঝে ফেলেছিল, ভবিষ্যৎ ব্যাটারির, আর এই ভবিষ্যৎকে তারা নিজেদের হাতে গড়বে।
২০০৩ সালে গবেষক মো ক এবং তার দল যখন চীনের লিথিয়াম ব্যাটারি শিল্পের অবস্থা খতিয়ে দেখেন, তখন দেশের হাতে ছিল মাত্র দুই কোম্পানি। ২০০৫ সালে প্রথম শিল্প সম্মেলনে জড়ো হয়েছিল মাত্র দুইশ মানুষ—একটি স্বপ্নের ভ্রূণাবস্থা। আজকের দানবীয় শিল্প দেখে সেই শুরু যেন অতীতের কোনো শান্ত আঁধার।
একসময় টোকিও, সনি কিংবা প্যানাসনিকের মতো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করত বৈদ্যুতিক ব্যাটারির বিশ্ব। দক্ষিণ কোরিয়া চেষ্টা করেছে শীর্ষে পৌঁছাতে। আর চীন তখনও খুঁজছিল নিজের পথ। কিন্তু ২০০6 সালে দেশটি ভবিষ্যতের দিকে যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে হাঁটা শুরু করল, সেটাই বদলে দিলো ইতিহাসের স্রোত। পরিষ্কার শক্তি, প্রযুক্তি, নবশক্তিচালিত যান—এই ছিল তাদের লক্ষ্য। সরকার শিল্পে ঢেলেছিল অগাধ সহায়তা, তৈরি করেছিল চার্জিং নেটওয়ার্ক, দিয়েছিল ভোক্তা প্রণোদনা।
তারপর ২০০৯ সালে যখন পুরনো অটোমোবাইল শিল্পে ব্যর্থতা কাটিয়ে নতুন করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর বাজি ধরল দেশটি, তখনই শুরু হলো সত্যিকারের দৌড়। তারা বিশ্বাস করল—ইভি এমন এক মঞ্চ, যেখানে পশ্চিমাদের সামনের সারি তেমন কঠিন নয়; সবাইই তখনো শেখার পর্যায়ে। আর সেই খালি মাঠে তারা দৌড়ে গেলো সর্বাগ্রে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ব্যাটারি প্রযুক্তির জন্ম দিলেও নানা ধাক্কা আর নীতির দোদুল্যমানতায় সে পথে হাঁটতে পারেনি। ২০০৮ অর্থনৈতিক সংকটের আঘাতে বহু উদীয়মান ব্যাটারি কোম্পানির পতন ঘটে। অনেক প্রযুক্তিই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কিনে নিলো। এই সুযোগ তৈরি করল শক্তিশালী ভিত্তি।
২০১২ থেকে ২০২0—এই আট বছর যেন চীনের ব্যাটারি সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ। বিপুল ভর্তুকি, শিল্প উন্নয়নের রোডম্যাপ, কঠোর প্রযুক্তিগত মানদণ্ড—এসব মিলিয়ে অল্প সময়ে দেশটিতে ইভি উৎপাদন আকাশছোঁয়া হলো। আর ২০১৫ সালে যখন চীন শুধু দেশীয় ব্যাটারি ব্যবহারকারীদেরই ভর্তুকি দেয়, তখন কার্যত বিদেশি কোম্পানির প্রবেশ পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে সবাই হাত বাড়ালো CATL কিংবা BYD এর দিকে।
এই হঠাৎ বদলে যাওয়া বাজার CATL কে করে তোলে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারি নির্মাতা। আর সরকারের পরবর্তী কর্মসূচিগুলো আরও এগিয়ে নিলো এই প্রতিযোগিতাকে—যেখানে প্রতিটি নীতি যেন নতুন এক শিল্প প্রতিযোগিতার জন্ম দিতো। চীন তার কোম্পানিগুলোকে দৌড়াতে শিখিয়েছে; যারা পিছিয়ে পড়েছে, তারা স্বাভাবিক নিয়মেই ছিটকে গেছে।
চীনের শক্তি শুধু বড় কারখানা নয়; তার শক্তি কিংবদন্তি প্রকৌশলীরা। হাজার হাজার অভিজ্ঞ ব্যাটারি বিশেষজ্ঞ, যারা গবেষণা আর কারখানার জমিন দুটোই বোঝে। তারা জানে কোন উপাদান কীভাবে বদলাতে হবে, কোন প্রক্রিয়া কোথায় ঠিক করতে হবে। অল্প খরচে, বৃহৎ উৎপাদনে, উন্নত মান—এই তিনই তাদের সাফল্যের আসল রহস্য।
CATL এর ২০২৪ সালের ৪০ শতাংশ বৈশ্বিক বাজার দখল তাই অযাচিত নয়। BYD এর ব্লেড ব্যাটারির মতো উদ্ভাবন আবার পুরো শিল্পের দিকই পাল্টে দিয়েছে। চীন যে শুধু দ্রুত তৈরি করতে পারে তা নয়—তারা তৈরি করে এমন জিনিস, যা সস্তা, নিরাপদ, শক্তিশালী।
এখন প্রশ্ন, কেউ কি হারাতে পারবে এই দৌড়ে চীনকে? বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন—এটি খুব কঠিন হবে। কারণ চীন শুধু প্রযুক্তিতেই নয়, সরবরাহ চেইন, মানবসম্পদ, উৎপাদন সবক্ষেত্রে দুই দশকের ব্যবধানে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
তবুও আশা আছে। আগামী প্রজন্মের ব্যাটারি প্রযুক্তি—যেমন সলিডস্টেট ব্যাটারি—নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দিতে পারে। সেখানে এখনো মাঠ পুরোপুরি দখল হয়নি। তবে স্কেল বাড়াতে পশ্চিমাদের যে কারিগরি দক্ষতা লাগবে, তা একদিনে সম্ভব নয়।
তবুও একটি সত্য অটল—এই দীর্ঘ দুই দশকের যাত্রাপথ চীনকে ইভি ব্যাটারি বিশ্বের অদ্বিতীয় খেলোয়াড় করে তুলেছে। আর এই দৌড়ে তারা এমন দূর এগিয়ে গেছে যে অনেকেই ভাবছেন, আগামী বহু বছরেও তাদের ছুঁতে পারা যাবে না।
বিশ্বের ব্যাটারি দুনিয়া যেন আজ চীনের হাতে গড়া এক বিশাল, স্পন্দিত মহাকাব্য।
















