Dhaka ০৫:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

বিমান বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বহর সম্প্রসারণ: যুক্তরাষ্ট্রে বোয়িং ও অক্টোবরে এয়ারবাস চুক্তির সম্ভাবনা

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৯:৪৭:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৯ বার দেখা হয়েছে

জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমান বাংলাদেশ বর্তমানে রুটভিত্তিক যাত্রীচাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত আকাশযানের অভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছে না। সচল বহরের কোনো একটি উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলেই তা বিঘ্নিত করছে নির্ধারিত ফ্লাইট সূচিকে। উদ্ভূত এই সংকট কাটাতে এবং রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের পরিধি বাড়াতে নতুন করে আরও ২১টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার।

এর আগে মার্কিন উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সাথে ১৪টি আকাশযান কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছিল বিমান। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, উক্ত কোম্পানির কাছ থেকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় আকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সাথে ১০টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের চুক্তি প্রক্রিয়াও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে অবগত হওয়া গেছে।

ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পার্শ্ববৈঠকে বোয়িংয়ের সাথে নতুন ১১টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হতে পারে। উক্ত অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। অন্যদিকে, আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে অবশিষ্ট ১০টি উড়োজাহাজ কেনার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বিমানের ঊর্ধ্বতন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় বিমানে ১৯টি আকাশযান সচল রয়েছে। গত এপ্রিল মাসে বোয়িংয়ের সাথে প্রথম দফায় ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের চুক্তি সই হয়েছিল। নতুন করে বোয়িংয়ের ১১টি এবং এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত করা সম্ভব হলে আগামী কয়েক বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রীয় এই পতাকাবাহীর বহরে মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪টিতে পৌঁছাবে।

বোয়িং ও এয়ারবাসের সাথে প্রস্তাবিত এই দুটি ক্রয়চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হলে তা হবে বিমানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিসরের বহর বৃদ্ধির পদক্ষেপ।

উল্লেখ্য, বিগত এপ্রিল মাসে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বোয়িংয়ের সাথে ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের প্রাথমিক চুক্তি সই করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। যে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০৩১ সালের নভেম্বর মাস থেকে এই উড়োজাহাজগুলো বাংলাদেশে আসা শুরু হবে এবং ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সবগুলোর সরবরাহ সম্পূর্ণ হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে নতুন প্রস্তাবিত বোয়িংয়ের ১১টি উড়োজাহাজের সুনির্দিষ্ট মডেল, বাজারমূল্য, অর্থায়নের উৎস কিংবা বাংলাদেশে পৌঁছানোর সময়সূচি সংক্রান্ত বিষয়গুলো এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

অপরদিকে এয়ারবাসের সাথে সম্ভাব্য চুক্তির শর্তানুযায়ী, চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারোবডি ক্যাটাগরির উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

যদিও এই দুটি নতুন চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার বা বিমানের পক্ষ থেকে কোনো সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়নি, তবে গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহে আয়োজিত এক সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছিলেন যে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, বিমানের সামগ্রিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ ক্রয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করা হয়। এছাড়া জরুরি ভিত্তিতে বহরে নতুন আকাশযান যুক্ত করার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও হাইকমিশনারকে অবগত করা হয়।

অন্যদিকে, বোয়িং থেকে নতুন করে উড়োজাহাজ ক্রয়ের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে বিগত ৩০ আগস্ট। ওই দিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় উল্লেখ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘আরেকটি চমৎকার সমঝোতায়’ উপনীত হয়েছেন।

তিনি তাঁর পোস্টে দাবি করেন, বাংলাদেশ বাড়তি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে বিপুল পরিমাণ ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার’ বিনিয়োগ করবে এবং তাঁদের পূর্ববর্তী ক্রয়াদেশের ব্যাপ্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে। পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উক্ত পোস্টটি পুনঃপ্রচার করেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি পাঠিয়ে এই উড়োজাহাজ ক্রয়ের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

সার্জিও গোরের বার্তা ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিঠির প্রেক্ষাপটে গত ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় বিমান খাতের সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই বহর সম্প্রসারণের এই মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরবর্তীতে গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক আয়োজনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির পুনর্ব্যক্ত করেন, নতুন নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করা ও নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার স্বার্থেই বাংলাদেশের আকাশযানের বহর বড় করা দরকার। এ ক্ষেত্রে বোয়িং কিংবা এয়ারবাস—যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি বাংলাদেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক এখতিয়ারভুক্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার সাথে যুক্ত সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গত মাসেই ফরাসি প্রতিষ্ঠানটির সাথে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিয়েছিল বিমান। সে সময় সই না হলেও চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যেই চুক্তিটি হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উক্ত সূত্রের দাবি, এয়ারবাস তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব পেশ করেছে এবং চুক্তি সইয়ের পরপরই দ্রুততম সময়ে এগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে আশ্বস্ত করেছে। প্রস্তাবিত চুক্তির মোট খরচের সর্বনিম্ন ৮৫ শতাংশ অর্থায়ন আসবে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের দেওয়া ঋণের মাধ্যমে। উড়োজাহাজ সরবরাহের পাশাপাশি সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও), বৈমানিক ও কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ, বহর পরিকল্পনা ও অভ্যন্তরীণ নকশা সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদানের প্রস্তাবও দিয়েছে এয়ারবাস।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি পণ্য বহনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘হাইরিস্ক কার্গো অ্যান্ড মেইল’ (এইচআরসিএম) তকমা প্রত্যাহারের তাগিদ দিয়েছে ঢাকা।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে নিরাপত্তার ঘাটতিকে অজুহাত দেখিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের আকাশপথে পণ্য পরিবহনের ওপর এইচআরসিএম নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বাজারে সরাসরি কার্গো বিমানে পণ্য পাঠাতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং কঠোর নজরদারির সম্মুখীন হতে হয়, যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে ধীরগতিসম্পন্ন ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

নিরাপত্তা বাড়াতে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে আধুনিক ব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি বহু দিন ধরে বাংলাদেশ এই প্রতিবন্ধকতা তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সাথে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপিত হয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, বর্তমান প্রশাসন দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই এইচআরসিএম মর্যাদা তুলে নেওয়ার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শাহজালালসহ অন্যান্য বিমানবন্দরে চাহিদানুযায়ী এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) বসানোর কাজ চলছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক অডিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর সন্তোষজনক মান অর্জন করেছে, তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অতি দ্রুত এইচআরসিএম স্ট্যাটাস প্রত্যাহার করা উচিত।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

বিমান বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বহর সম্প্রসারণ: যুক্তরাষ্ট্রে বোয়িং ও অক্টোবরে এয়ারবাস চুক্তির সম্ভাবনা

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০৯:৪৭:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমান বাংলাদেশ বর্তমানে রুটভিত্তিক যাত্রীচাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত আকাশযানের অভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারছে না। সচল বহরের কোনো একটি উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলেই তা বিঘ্নিত করছে নির্ধারিত ফ্লাইট সূচিকে। উদ্ভূত এই সংকট কাটাতে এবং রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের পরিধি বাড়াতে নতুন করে আরও ২১টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার।

এর আগে মার্কিন উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সাথে ১৪টি আকাশযান কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছিল বিমান। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, উক্ত কোম্পানির কাছ থেকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় আকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সাথে ১০টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের চুক্তি প্রক্রিয়াও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে অবগত হওয়া গেছে।

ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পার্শ্ববৈঠকে বোয়িংয়ের সাথে নতুন ১১টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হতে পারে। উক্ত অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। অন্যদিকে, আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে অবশিষ্ট ১০টি উড়োজাহাজ কেনার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বিমানের ঊর্ধ্বতন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় বিমানে ১৯টি আকাশযান সচল রয়েছে। গত এপ্রিল মাসে বোয়িংয়ের সাথে প্রথম দফায় ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের চুক্তি সই হয়েছিল। নতুন করে বোয়িংয়ের ১১টি এবং এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত করা সম্ভব হলে আগামী কয়েক বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রীয় এই পতাকাবাহীর বহরে মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪টিতে পৌঁছাবে।

বোয়িং ও এয়ারবাসের সাথে প্রস্তাবিত এই দুটি ক্রয়চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হলে তা হবে বিমানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিসরের বহর বৃদ্ধির পদক্ষেপ।

উল্লেখ্য, বিগত এপ্রিল মাসে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বোয়িংয়ের সাথে ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের প্রাথমিক চুক্তি সই করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। যে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০৩১ সালের নভেম্বর মাস থেকে এই উড়োজাহাজগুলো বাংলাদেশে আসা শুরু হবে এবং ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সবগুলোর সরবরাহ সম্পূর্ণ হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে নতুন প্রস্তাবিত বোয়িংয়ের ১১টি উড়োজাহাজের সুনির্দিষ্ট মডেল, বাজারমূল্য, অর্থায়নের উৎস কিংবা বাংলাদেশে পৌঁছানোর সময়সূচি সংক্রান্ত বিষয়গুলো এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

অপরদিকে এয়ারবাসের সাথে সম্ভাব্য চুক্তির শর্তানুযায়ী, চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারোবডি ক্যাটাগরির উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

যদিও এই দুটি নতুন চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার বা বিমানের পক্ষ থেকে কোনো সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়নি, তবে গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহে আয়োজিত এক সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছিলেন যে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, বিমানের সামগ্রিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ ক্রয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করা হয়। এছাড়া জরুরি ভিত্তিতে বহরে নতুন আকাশযান যুক্ত করার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও হাইকমিশনারকে অবগত করা হয়।

অন্যদিকে, বোয়িং থেকে নতুন করে উড়োজাহাজ ক্রয়ের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে বিগত ৩০ আগস্ট। ওই দিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় উল্লেখ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘আরেকটি চমৎকার সমঝোতায়’ উপনীত হয়েছেন।

তিনি তাঁর পোস্টে দাবি করেন, বাংলাদেশ বাড়তি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে বিপুল পরিমাণ ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার’ বিনিয়োগ করবে এবং তাঁদের পূর্ববর্তী ক্রয়াদেশের ব্যাপ্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে। পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উক্ত পোস্টটি পুনঃপ্রচার করেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি পাঠিয়ে এই উড়োজাহাজ ক্রয়ের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

সার্জিও গোরের বার্তা ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিঠির প্রেক্ষাপটে গত ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় বিমান খাতের সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই বহর সম্প্রসারণের এই মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরবর্তীতে গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক আয়োজনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির পুনর্ব্যক্ত করেন, নতুন নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করা ও নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার স্বার্থেই বাংলাদেশের আকাশযানের বহর বড় করা দরকার। এ ক্ষেত্রে বোয়িং কিংবা এয়ারবাস—যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকেই উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি বাংলাদেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক এখতিয়ারভুক্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার সাথে যুক্ত সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গত মাসেই ফরাসি প্রতিষ্ঠানটির সাথে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নিয়েছিল বিমান। সে সময় সই না হলেও চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যেই চুক্তিটি হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উক্ত সূত্রের দাবি, এয়ারবাস তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব পেশ করেছে এবং চুক্তি সইয়ের পরপরই দ্রুততম সময়ে এগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে আশ্বস্ত করেছে। প্রস্তাবিত চুক্তির মোট খরচের সর্বনিম্ন ৮৫ শতাংশ অর্থায়ন আসবে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের দেওয়া ঋণের মাধ্যমে। উড়োজাহাজ সরবরাহের পাশাপাশি সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও), বৈমানিক ও কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ, বহর পরিকল্পনা ও অভ্যন্তরীণ নকশা সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক সুবিধাদি প্রদানের প্রস্তাবও দিয়েছে এয়ারবাস।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি পণ্য বহনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘হাইরিস্ক কার্গো অ্যান্ড মেইল’ (এইচআরসিএম) তকমা প্রত্যাহারের তাগিদ দিয়েছে ঢাকা।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে নিরাপত্তার ঘাটতিকে অজুহাত দেখিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের আকাশপথে পণ্য পরিবহনের ওপর এইচআরসিএম নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বাজারে সরাসরি কার্গো বিমানে পণ্য পাঠাতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং কঠোর নজরদারির সম্মুখীন হতে হয়, যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে ধীরগতিসম্পন্ন ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

নিরাপত্তা বাড়াতে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে আধুনিক ব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি বহু দিন ধরে বাংলাদেশ এই প্রতিবন্ধকতা তুলে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সাথে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপিত হয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, বর্তমান প্রশাসন দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই এইচআরসিএম মর্যাদা তুলে নেওয়ার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শাহজালালসহ অন্যান্য বিমানবন্দরে চাহিদানুযায়ী এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) বসানোর কাজ চলছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক অডিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর সন্তোষজনক মান অর্জন করেছে, তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অতি দ্রুত এইচআরসিএম স্ট্যাটাস প্রত্যাহার করা উচিত।