ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে তাঁর অভিষেক ঘটেছে। আগামী বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে ভাষণ দেবেন তিনি। স্থানীয় সময় বিকেলে নির্ধারিত ১৫ মিনিটের ভাষণে তিনি বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানসহ বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তাঁর ভাষণে মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, গণমানুষের অধিকার, দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি প্রাধান্য পাবে।
এর আগে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ‘নর্থ ডেলিগেটস লাউঞ্জে’ সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে উক্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। উদ্বোধনী পর্বে বিশ্বমঞ্চে আগত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য, বিশ্ব সংস্থার এবারের অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, বৈশ্বিক সংঘাত নিরসন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো সময়োপযোগী বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দিনের কর্মসূচির শুরুতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত প্রাতরাশ অনুষ্ঠানেও অংশ নেন তিনি। পরবর্তীতে সন্ধ্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে দেওয়া বিশেষ অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানেও যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সুযোগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও কৌশলগত বৈঠকে অংশ নেন। এর মধ্যে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জোরদার করা, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়। পৃথক এক বৈঠকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের বিষয়গুলো নিয়ে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় দুই দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নতুন বিনিয়োগ ক্ষেত্র তৈরির বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। এছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দেন তিনি। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই এবং এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে গত সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি বাণিজ্যিক বিমানে তিনি নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। বিমানবন্দরে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। পরে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে তাঁকে নিউইয়র্কের ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রবাসী বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেলেও, সফরকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, জাতিসংঘের এই মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন। নিউইয়র্কে সব ধরনের সফরসূচি শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।






















