Dhaka ০৭:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

দীর্ঘমেয়াদী সংকট মোকাবিলায় জাতীয় রোহিঙ্গা নীতি ও সমন্বয় কাউন্সিল গঠন জরুরি

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:২৬:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৭ বার দেখা হয়েছে

বাংলাদেশ বর্তমানে নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানহীনতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। শিল্প-কারখানা ও সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা পূরণ করা যখন রাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন প্রায় এক দশক ধরে প্রায় ১২ লাখ রাষ্ট্রহীন মানুষের দায়ভার অনির্দিষ্টকাল ধরে একা বহন করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ কোনোভাবেই মানবিক দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান নয়, বরং একটি সীমিত সম্পদের দেশের সার্বিক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, জাতীয় অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবার সময় এসেছে।

গত প্রায় দশ বছর ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মানবিকতার স্বীকৃতি পেলেও সংকটটি এখন আর সাময়িক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। জরুরি ত্রাণের বৃত্ত পেরিয়ে এটি এখন অর্থনীতি, জনসংখ্যা, পরিবেশ, নিরাপত্তা, শ্রমবাজার এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার এক গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। দেশের সাধারণ নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই যেখানে চ্যালেঞ্জিং, সেখানে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ও জীবনযাত্রার খরচ বহন করা কতদিন সম্ভব, তা জাতীয় নীতির মূল কেন্দ্রে আসা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় টাস্ক ফোর্স (এনটিএফ) কিংবা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা ক্যাম্প পরিচালনা করলেও সেখানে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতিগত কাঠামোর বড় অভাব রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার পরিবর্তে মানবিক ব্যবস্থাপনা, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে একই সুতোয় বাঁধতে একটি ‘জাতীয় রোহিঙ্গা নীতি’ প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। এর পাশাপাশি বিদ্যমান সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মধ্যে সুসংহত সমন্বয় সাধনের জন্য একটি কার্যকর ‘জাতীয় রোহিঙ্গা সমন্বয় কাউন্সিল’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।

রোহিঙ্গাদের কেবল ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে তাদের মধ্যে হতাশা, নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই স্থানীয় শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত না করে, নির্দিষ্ট বিধিমালা ও কঠোর নজরদারির আওতায় ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় একটি নিয়ন্ত্রিত দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। যেখানে রোহিঙ্গা তরুণদের পোশাক তৈরি, হস্তশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে এর মূল শর্ত হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেন কোনোভাবেই বঞ্চিত না হয় এবং দুই পক্ষই এর সুফল লাভ করে।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ভূমিকার চরিত্র বদলানোর সময় এসেছে। সাহায্য কেবল সাময়িক খাদ্য বা ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ না রেখে তা ধীরে ধীরে দক্ষতা উন্নয়ন, জীবিকা নির্বাহ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে রূপান্তর করতে হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর আর্থিক চাপ যেমন কমবে, তেমনি স্থানীয় মানুষের মনে তৈরি হওয়া বঞ্চনার অনুভূতিও দূর করা সম্ভব হবে।

সবশেষে, মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই যে এই সংকটের একমাত্র চূড়ান্ত সমাধান—তাতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষা দীর্ঘ হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রোহিঙ্গাদের অমানবিক অবস্থায় না রেখে মানুষ ও ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। একটি সুসংহত জাতীয় নীতি ও কার্যকর সমন্বয় কাউন্সিলের মাধ্যমেই কেবল কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখা, ক্যাম্প পরিচালনা সুশৃঙ্খল করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

দীর্ঘমেয়াদী সংকট মোকাবিলায় জাতীয় রোহিঙ্গা নীতি ও সমন্বয় কাউন্সিল গঠন জরুরি

সর্বশেষ হালনাগাদ : ০১:২৬:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ বর্তমানে নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানহীনতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। শিল্প-কারখানা ও সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা পূরণ করা যখন রাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন প্রায় এক দশক ধরে প্রায় ১২ লাখ রাষ্ট্রহীন মানুষের দায়ভার অনির্দিষ্টকাল ধরে একা বহন করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ কোনোভাবেই মানবিক দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান নয়, বরং একটি সীমিত সম্পদের দেশের সার্বিক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, জাতীয় অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভাবার সময় এসেছে।

গত প্রায় দশ বছর ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মানবিকতার স্বীকৃতি পেলেও সংকটটি এখন আর সাময়িক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। জরুরি ত্রাণের বৃত্ত পেরিয়ে এটি এখন অর্থনীতি, জনসংখ্যা, পরিবেশ, নিরাপত্তা, শ্রমবাজার এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার এক গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। দেশের সাধারণ নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই যেখানে চ্যালেঞ্জিং, সেখানে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ও জীবনযাত্রার খরচ বহন করা কতদিন সম্ভব, তা জাতীয় নীতির মূল কেন্দ্রে আসা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় টাস্ক ফোর্স (এনটিএফ) কিংবা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা ক্যাম্প পরিচালনা করলেও সেখানে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতিগত কাঠামোর বড় অভাব রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার পরিবর্তে মানবিক ব্যবস্থাপনা, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে একই সুতোয় বাঁধতে একটি ‘জাতীয় রোহিঙ্গা নীতি’ প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। এর পাশাপাশি বিদ্যমান সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মধ্যে সুসংহত সমন্বয় সাধনের জন্য একটি কার্যকর ‘জাতীয় রোহিঙ্গা সমন্বয় কাউন্সিল’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।

রোহিঙ্গাদের কেবল ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে তাদের মধ্যে হতাশা, নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই স্থানীয় শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত না করে, নির্দিষ্ট বিধিমালা ও কঠোর নজরদারির আওতায় ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় একটি নিয়ন্ত্রিত দক্ষতা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। যেখানে রোহিঙ্গা তরুণদের পোশাক তৈরি, হস্তশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে এর মূল শর্ত হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠী যেন কোনোভাবেই বঞ্চিত না হয় এবং দুই পক্ষই এর সুফল লাভ করে।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ভূমিকার চরিত্র বদলানোর সময় এসেছে। সাহায্য কেবল সাময়িক খাদ্য বা ত্রাণ সহায়তায় সীমাবদ্ধ না রেখে তা ধীরে ধীরে দক্ষতা উন্নয়ন, জীবিকা নির্বাহ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে রূপান্তর করতে হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর আর্থিক চাপ যেমন কমবে, তেমনি স্থানীয় মানুষের মনে তৈরি হওয়া বঞ্চনার অনুভূতিও দূর করা সম্ভব হবে।

সবশেষে, মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই যে এই সংকটের একমাত্র চূড়ান্ত সমাধান—তাতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষা দীর্ঘ হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রোহিঙ্গাদের অমানবিক অবস্থায় না রেখে মানুষ ও ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। একটি সুসংহত জাতীয় নীতি ও কার্যকর সমন্বয় কাউন্সিলের মাধ্যমেই কেবল কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখা, ক্যাম্প পরিচালনা সুশৃঙ্খল করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।