ক্রমবর্ধিত নগরায়ণের ফলে শহরের উৎপাদিত বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর জোরালো গুরুত্ব আরোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, বর্জ্যকে কোনোভাবেই গলার কাঁটা বা বোঝা হিসেবে না দেখে বরং একে লাভজনক সম্পদে রূপান্তর করার জন্য কার্যকর সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব, অন্যদিকে দেশের জ্বালানি খাতের চাহিদাও মেটানো যেতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সচিবালয়ে অবস্থিত স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলনকক্ষে চীনভিত্তিক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘ঝেজিয়াং ওয়েইমিং ইনভাইরনমেন্টাল প্রোটেকশন কোম্পানি লিমিটেড’-এর উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আয়োজিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী এই অভিমত ব্যক্ত করেন। উক্ত বৈঠকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বর্জ্য পুড়িয়ে তা থেকে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই মহাপরিকল্পনার কারিগরি রূপরেখা, সম্ভাব্য বিনিয়োগের মডেল এবং বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নিয়ে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী বর্তমান সময়ের দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে বলেন যে, রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এসব বর্জ্য যদি যথাসময়ে এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা না যায়, তবে তা পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করার পুরো প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। পরিকল্পিত উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা বর্তমান যুগের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উদ্যোগ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত সুরক্ষা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন যে, এ ধরনের কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়ার পূর্বে এর পরিবেশগত প্রভাব, ব্যবহৃত প্রযুক্তির কার্যকারিতা, জনস্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া এবং সার্বিক পরিচালন ব্যবস্থা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। এছাড়া প্রকল্পের আর্থিক বিনিয়োগ কাঠামো এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে এটি দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ টেকসই হয় এবং সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের ওপর কোনো ধরনের অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে। একই সঙ্গে পুরো প্রকল্প পরিচালনায় সর্বোচ্চ দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখার ওপরও তিনি বিশেষ জোর দেন।
বৈঠকে উপস্থাপিত ব্রিফিংয়ে প্রকল্পের কারিগরি দিক, বিনিয়োগের সম্ভাব্য ধরন, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপসমূহ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিমন্ত্রী ও চীনা প্রতিনিধি দলের সদস্যরা প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন সম্ভাব্য মডেল নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যান। প্রতিমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন, যেখানে কেবল বর্জ্য অপসারণ নয়, বরং বর্জ্যের যথাযথ পুনর্ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার ওপরও বিশেষ নজর দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান যে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে, তবে তা যেন অবশ্যই বাংলাদেশের সার্বিক বাস্তবতা, বর্জ্যের ধরন এবং স্থানীয় পরিবেশগত পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বৈঠকে ঝেজিয়াং ওয়েইমিং ইনভাইরনমেন্টাল প্রোটেকশন কোম্পানির পরিবেশ সংরক্ষণ গ্রুপের চেয়ারম্যান চেং উলিয়াং তাদের প্রতিষ্ঠানের উন্নত প্রযুক্তি ও পরিবেশ সুরক্ষার কার্যক্রমগুলো তুলে ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে কারিগরি ও বিনিয়োগে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন। উক্ত বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানসহ মন্ত্রণালয় ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। পরিশেষে, প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো আরও গভীর ও নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়।






















