ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত রাজ্য মণিপুরে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জাতিগত সহিংসতার দুটি পৃথক ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
গত রোববার প্রকাশিত এক প্রশাসনিক বিবৃতিতে স্থানীয় পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, শনিবার রাজ্যের ননি জেলা এলাকায় ‘অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীদের’ সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় কুকি সম্প্রদায়ের তিন সদস্য নিহত হন।
পরবর্তীতে পৃথক আরেকটি বিবৃতিতে পুলিশ প্রশাসন জানায়, গত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় থেকে হঠাৎ নিখোঁজ থাকা একই কুকি সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তির নিথর দেহ গতকাল রোববার সকালে রাজ্যের কাংপোকপি জেলা এলাকা থেকে নিরাপত্তা বাহিনী উদ্ধার করে। ওই অঞ্চলে টানা তল্লাশি অভিযান চালিয়ে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, কুকি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সামাজিক সংগঠন এই হত্যাকাণ্ডের জন্য নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোকে সরাসরি অভিযুক্ত করেছে। এই আক্রমণকে তারা নিজেদের ‘মাতৃভূমিতে বিনা উস্কানিতে চালানো নগ্ন হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
মণিপুরে সক্রিয় কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পাদিত বহুল আলোচিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের দাবিতে যখন রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলসহ বিভিন্ন শহর ও লোকালয়ে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ মানুষ রাজপথে গণবিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন, ঠিক সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই এই প্রাণঘাতী হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটল।
উল্লেখ্য, ভারতের দুর্গম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যে নিজস্ব জাতিগত আবাসভূমির স্বাধিকার ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবিকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ কুকি ও নাগা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু দশক ধরে রক্তাক্ত সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে কুকি সম্প্রদায়ের কিছু যুবকের হাতে এক নাগা ব্যক্তি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত বা আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।
পরবর্তীতে মে মাসে তিনজন কুকি যাজক নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। সেই হত্যাকাণ্ডের পেছনে নাগা সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাত রয়েছে বলে প্রবল অভিযোগ ওঠে। এর পর থেকেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিশোধমূলক অপহরণ, পাল্টা হামলা ও প্রাণঘাতী হত্যাকাণ্ডের এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মণিপুরের পাহাড়ি কুকি সম্প্রদায় ইতোমধ্যে সমতলের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ের সঙ্গেও দীর্ঘ দিন ধরে রক্তক্ষয়ী জাতিগত সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের মে মাসে মূলত বিশেষ সরকারি অর্থনৈতিক সুবিধা এবং সরকারি চাকরির কোটা পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত আইনি বিতর্ককে কেন্দ্র করে মেইতেই ও কুকিদের সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল। সেই চলমান সংকটের মধ্যেই এখন কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মাঝে নতুন করে শুরু হওয়া এই রক্তাক্ত সংঘর্ষ মণিপুরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক উত্তেজনায় মারাত্মক নতুন মাত্রা যোগ করল।






















