Dhaka ০১:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

পিরোজপুরে ২৪ শিক্ষকের দুই কলেজে ৭ শিক্ষার্থী অংশ নিলেও এইচএসসিতে সবাই ফেল

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:২৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • ৬ বার দেখা হয়েছে

উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে পিরোজপুর জেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখা থেকে অংশগ্রহণকারী সব শিক্ষার্থীই ফেল করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট ২৪ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মাত্র সাতজন শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

আলোচিত এই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো—নাজিরপুরের ‘দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ’ এবং পিরোজপুর সদর উপজেলার ‘কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ’।

গত রোববার (১ নভেম্বর) সরেজমিন অনুসন্ধানে ও শিক্ষা বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কলেজ দুটিতে মোট আটজন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র সাতজন। কিন্তু ফলাফলের দিনে দেখা যায় তাদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।

দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের চিত্র: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজিরপুরের দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের কলেজ শাখাটি ২০১৪ সালে তৎকালীন সময়ে পাঠদানের সরকারি অনুমতি লাভ করে। তবে গত চার বছরের প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে পাস করা শিক্ষার্থীর তুলনায় ফেল বা অনুত্তীর্ণের হারই সবসময় বেশি ছিল।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে এই কলেজ থেকে ৩৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছিল মাত্র ১৮ জন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ২৭ জনের মধ্যে পাস করে ১৩ জন এবং ২০২৫ সালে ১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে মাত্র পাঁচজন। আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অথচ কাগজে-কলমে এই কলেজ শাখায় বর্তমানে আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন।

কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের চিত্র: অন্যদিকে, পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখাটি অপেক্ষাকৃত নতুন, যা ২০২৩ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। সূরুরলগ্ন থেকেই এই শাখার পাসের হার তুলনামূলক বেশ কম ছিল।

জানা যায়, ২০২৩ সালে কলেজটি থেকে ১২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে ৭ জনের মধ্যে পাস করে ৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৭ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন পাস করতে সক্ষম হয়। আর চলতি বছরের এইচএসসিতে তিনজন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও চূড়ান্তভাবে পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র দুজন। কিন্তু তাঁদের কেউই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হন এবং দুজনেই ফেল করেন।

তবে কলেজ শাখার চিত্র হতাশাঞ্জক হলেও এই একই প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখার মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফল বরাবরই বেশ সন্তোষজনক। গত চার বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে ৮৪ জনের মধ্যে ৭৫ জন, ২০২৪ সালে ৭৫ জনের মধ্যে ৬৯ জন, ২০২৫ সালে ৭০ জনের মধ্যে ৪৮ জন এবং ২০২৬ সালে ৫০ জনের মধ্যে ৪৫ জন শিক্ষার্থী সফলভাবে পাস করেছে। এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৬ জন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী কর্মরত আছেন।

জেলার সার্বিক ফলাফল ও পরিসংখ্যানি চিত্র: এদিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ছয়টি জেলার মধ্যে পাসের হারের দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে পিরোজপুর জেলা এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল জেলা। তা সত্ত্বেও গত দুই বছরের ব্যবধানে পিরোজপুরে এইচএসসি পরীক্ষার সামগ্রিক পাসের হার নাটকীয়ভাবে ৩১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে। ২০০৯ সাল থেকে প্রাপ্ত বোর্ডের দীর্ঘ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরই জেলায় সর্বনিমড়্ গত বছরের তুলনায় পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর পিরোজপুর জেলা থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ৭ হাজার ৯৮ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। এর মধ্যে পরীক্ষায় সশরীরে অংশ নেয় ৬ হাজার ৭৮২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে ৩ হাজার ৪৯৬ জন। সে হিসাবে পুরো জেলায় এ বছর পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এছাড়া জিপিএ-৫ লাভ করেছে মোটে ৬৬ জন শিক্ষার্থী।

জেলার বিগত বছরের ফলাফলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল বেশ ভালো—৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে তা একলাফে কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ফলাফলে পাসের হার আরও পতন ঘটে দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশে।

অভিভাবকদের মতামত ও আক্ষেপ: কদমতলা এলাকার স্থানীয় এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. সাইদুল ইসলাম জানান, গত বছর এই কলেজে নতুন করে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এর আগের বছর ভর্তি হওয়া মাত্র দুজন শিক্ষার্থীই এ বছর পুনরায় পরীক্ষা দিয়েছিল। যেহেতু তারা গত বছরও অকৃতকার্য হয়েছিল এবং এবারও পাস করতে পারেনি, সে কারণেই মূলত কলেজ শাখার ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। তিনি মনে করেন, এই কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় এলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানেই স্বাচ্ছন্দ্যে ভর্তি হতো, যার ফলে ফলাফলের চিত্রও ইতিবাচক হতো।

স্থানীয় অপর অভিভাবক সুমি আক্তার বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখার পড়াশোনার মান ও ফলাফল ভালো হলেও কলেজ শাখার করুণ দশা চলছে। যারা গত বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছিল, মূলত তারাই এবার আবার পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে।

এলাকার বাসিন্দা মো. মাসুম বিল্লাহ ও সুলতানা জেসমিন মাহিনুর বলেন, তাঁরাও এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী। এখানে মাধ্যমিকের ফলাফল চমৎকার হলেও ২০২৩ সালে চালু হওয়া কলেজ শাখাটি অদ্যাবধি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এসএসসিতে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে অন্যত্র ভর্তি হয়। কলেজটি দ্রুত এমপিওভুক্ত করা হলে এলাকার গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের দূরের শহরে গিয়ে বাড়তি খরচ করে পড়াশোনা করতে হতো না।

শিক্ষক ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক সুমন বিশ্বাস জানান, ২০১৪ সালে কলেজ শাখাটি চালুর পর থেকে প্রতিবছরই নিয়মিত পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে ফলাফল মোটামুটি সন্তোষজনক থাকলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকরা সরকারি কোনো ধরনের বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এর ফলে শিক্ষকসমাজ চরম আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।

তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নন-এমপিও হওয়ার কারণে এই প্রতিষ্ঠানে নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চায় না। তারপরও কোনোমতে কলেজটি টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছর কোনো রকমে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তাদের উপস্থিতি শূন্যের কোঠায় নেমেছে। শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বলে কলেজে আসার নাম করে আসে না, যার কারণে পাঠদান সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে এবং পরীক্ষার ফলাফলেও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমনকি আজ ছয়জন শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও একজন শিক্ষার্থীকেও ক্লাসে পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত উপস্থিত না হলে ভালো ফলাফল করা ককখনোই সম্ভব নয়। মূলত শিক্ষার্থীদের এই চরম অনুপস্থিতিই ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।”

কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তাঁদের বিদ্যালয় শাখার শিক্ষার মান ও ফলাফল বরাবরই বেশ ভালো। কলেজ শাখার পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর শুরুর দিকে ফলাফল সন্তোষজনক হলেও এ বছর নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় সার্বিক ফলাফলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই করুণ অবস্থার স্থায়ী উন্নতির জন্য কলেজ শাখাটিকে অবিলম্বে এমপিওভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও যোগ করেন, এটি মূলত একটি মফস্বল বা গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজ শাখায় নিয়মিত পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পদ নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়েই বিদ্যালয় শাখার শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কলেজের উচ্চমাধ্যমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত এমপিওভুক্ত হলে প্রয়োজনীয় নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনার জন্য জেলা শহরে ছুটতে হবে না এবং নিজ এলাকাতেই তারা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে।

শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া: বরিশাল অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন এই প্রসঙ্গে জানান, যে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও কাঙ্ক্ষিত ফলাফলে উত্তীর্ণ হতে পারেনি, সেই সকল প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে খুব দ্রুত জেলাভিত্তিক বিশেষ সভা করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমেছে, তার অধিকাংশই নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মানুযায়ী সরাসরি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া গেলেও নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত দিনের সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে একটি স্থায়ী ও বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

জনপ্রিয়

মালদ্বীপের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, প্রবাসীদের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা

পিরোজপুরে ২৪ শিক্ষকের দুই কলেজে ৭ শিক্ষার্থী অংশ নিলেও এইচএসসিতে সবাই ফেল

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১১:২৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে পিরোজপুর জেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখা থেকে অংশগ্রহণকারী সব শিক্ষার্থীই ফেল করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট ২৪ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মাত্র সাতজন শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

আলোচিত এই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো—নাজিরপুরের ‘দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ’ এবং পিরোজপুর সদর উপজেলার ‘কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ’।

গত রোববার (১ নভেম্বর) সরেজমিন অনুসন্ধানে ও শিক্ষা বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কলেজ দুটিতে মোট আটজন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র সাতজন। কিন্তু ফলাফলের দিনে দেখা যায় তাদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।

দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের চিত্র: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজিরপুরের দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের কলেজ শাখাটি ২০১৪ সালে তৎকালীন সময়ে পাঠদানের সরকারি অনুমতি লাভ করে। তবে গত চার বছরের প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে পাস করা শিক্ষার্থীর তুলনায় ফেল বা অনুত্তীর্ণের হারই সবসময় বেশি ছিল।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে এই কলেজ থেকে ৩৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছিল মাত্র ১৮ জন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে ২৭ জনের মধ্যে পাস করে ১৩ জন এবং ২০২৫ সালে ১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে মাত্র পাঁচজন। আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাদের একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। অথচ কাগজে-কলমে এই কলেজ শাখায় বর্তমানে আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন।

কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের চিত্র: অন্যদিকে, পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখাটি অপেক্ষাকৃত নতুন, যা ২০২৩ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। সূরুরলগ্ন থেকেই এই শাখার পাসের হার তুলনামূলক বেশ কম ছিল।

জানা যায়, ২০২৩ সালে কলেজটি থেকে ১২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে ৭ জনের মধ্যে পাস করে ৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৭ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন পাস করতে সক্ষম হয়। আর চলতি বছরের এইচএসসিতে তিনজন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও চূড়ান্তভাবে পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র দুজন। কিন্তু তাঁদের কেউই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হন এবং দুজনেই ফেল করেন।

তবে কলেজ শাখার চিত্র হতাশাঞ্জক হলেও এই একই প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখার মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফল বরাবরই বেশ সন্তোষজনক। গত চার বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে ৮৪ জনের মধ্যে ৭৫ জন, ২০২৪ সালে ৭৫ জনের মধ্যে ৬৯ জন, ২০২৫ সালে ৭০ জনের মধ্যে ৪৮ জন এবং ২০২৬ সালে ৫০ জনের মধ্যে ৪৫ জন শিক্ষার্থী সফলভাবে পাস করেছে। এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৬ জন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী কর্মরত আছেন।

জেলার সার্বিক ফলাফল ও পরিসংখ্যানি চিত্র: এদিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ছয়টি জেলার মধ্যে পাসের হারের দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে পিরোজপুর জেলা এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল জেলা। তা সত্ত্বেও গত দুই বছরের ব্যবধানে পিরোজপুরে এইচএসসি পরীক্ষার সামগ্রিক পাসের হার নাটকীয়ভাবে ৩১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে। ২০০৯ সাল থেকে প্রাপ্ত বোর্ডের দীর্ঘ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরই জেলায় সর্বনিমড়্ গত বছরের তুলনায় পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর পিরোজপুর জেলা থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ৭ হাজার ৯৮ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। এর মধ্যে পরীক্ষায় সশরীরে অংশ নেয় ৬ হাজার ৭৮২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে ৩ হাজার ৪৯৬ জন। সে হিসাবে পুরো জেলায় এ বছর পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এছাড়া জিপিএ-৫ লাভ করেছে মোটে ৬৬ জন শিক্ষার্থী।

জেলার বিগত বছরের ফলাফলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল বেশ ভালো—৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে তা একলাফে কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ফলাফলে পাসের হার আরও পতন ঘটে দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশে।

অভিভাবকদের মতামত ও আক্ষেপ: কদমতলা এলাকার স্থানীয় এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. সাইদুল ইসলাম জানান, গত বছর এই কলেজে নতুন করে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এর আগের বছর ভর্তি হওয়া মাত্র দুজন শিক্ষার্থীই এ বছর পুনরায় পরীক্ষা দিয়েছিল। যেহেতু তারা গত বছরও অকৃতকার্য হয়েছিল এবং এবারও পাস করতে পারেনি, সে কারণেই মূলত কলেজ শাখার ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। তিনি মনে করেন, এই কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় এলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানেই স্বাচ্ছন্দ্যে ভর্তি হতো, যার ফলে ফলাফলের চিত্রও ইতিবাচক হতো।

স্থানীয় অপর অভিভাবক সুমি আক্তার বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখার পড়াশোনার মান ও ফলাফল ভালো হলেও কলেজ শাখার করুণ দশা চলছে। যারা গত বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছিল, মূলত তারাই এবার আবার পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে।

এলাকার বাসিন্দা মো. মাসুম বিল্লাহ ও সুলতানা জেসমিন মাহিনুর বলেন, তাঁরাও এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী। এখানে মাধ্যমিকের ফলাফল চমৎকার হলেও ২০২৩ সালে চালু হওয়া কলেজ শাখাটি অদ্যাবধি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এসএসসিতে ভালো ফল করা শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে অন্যত্র ভর্তি হয়। কলেজটি দ্রুত এমপিওভুক্ত করা হলে এলাকার গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের দূরের শহরে গিয়ে বাড়তি খরচ করে পড়াশোনা করতে হতো না।

শিক্ষক ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক সুমন বিশ্বাস জানান, ২০১৪ সালে কলেজ শাখাটি চালুর পর থেকে প্রতিবছরই নিয়মিত পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে ফলাফল মোটামুটি সন্তোষজনক থাকলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকরা সরকারি কোনো ধরনের বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এর ফলে শিক্ষকসমাজ চরম আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।

তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নন-এমপিও হওয়ার কারণে এই প্রতিষ্ঠানে নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চায় না। তারপরও কোনোমতে কলেজটি টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছর কোনো রকমে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তাদের উপস্থিতি শূন্যের কোঠায় নেমেছে। শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বলে কলেজে আসার নাম করে আসে না, যার কারণে পাঠদান সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে এবং পরীক্ষার ফলাফলেও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমনকি আজ ছয়জন শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও একজন শিক্ষার্থীকেও ক্লাসে পাওয়া যায়নি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত উপস্থিত না হলে ভালো ফলাফল করা ককখনোই সম্ভব নয়। মূলত শিক্ষার্থীদের এই চরম অনুপস্থিতিই ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।”

কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তাঁদের বিদ্যালয় শাখার শিক্ষার মান ও ফলাফল বরাবরই বেশ ভালো। কলেজ শাখার পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর শুরুর দিকে ফলাফল সন্তোষজনক হলেও এ বছর নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় সার্বিক ফলাফলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই করুণ অবস্থার স্থায়ী উন্নতির জন্য কলেজ শাখাটিকে অবিলম্বে এমপিওভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও যোগ করেন, এটি মূলত একটি মফস্বল বা গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজ শাখায় নিয়মিত পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পদ নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়েই বিদ্যালয় শাখার শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কলেজের উচ্চমাধ্যমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত এমপিওভুক্ত হলে প্রয়োজনীয় নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনার জন্য জেলা শহরে ছুটতে হবে না এবং নিজ এলাকাতেই তারা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে।

শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া: বরিশাল অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন এই প্রসঙ্গে জানান, যে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও কাঙ্ক্ষিত ফলাফলে উত্তীর্ণ হতে পারেনি, সেই সকল প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে খুব দ্রুত জেলাভিত্তিক বিশেষ সভা করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমেছে, তার অধিকাংশই নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মানুযায়ী সরাসরি প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া গেলেও নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত দিনের সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে একটি স্থায়ী ও বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।