দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে শুধু যত্রতত্র নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করে কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ডায়ালিসিস মেশিন কিনে অসুস্থ মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা বা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো সম্ভব হবে না বলে জোরালো মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত। একই সাথে দেশের চিকিৎসা খাতের সামগ্রিক দুর্নীতি ও বিগত দিনের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন, এ দেশের সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসার জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত অর্থের একটি টাকাও কোনো অবস্থাতেই দুর্নীতির গহ্বরে হারিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে রাজধানী ঢাকায় ‘বিশ্ব আয়োডিন দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব কথা বলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), গেইন, নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল এবং দেশের শিল্প ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে এই বিশেষ আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত আরও স্পষ্ট করে বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও স্বাস্থ্যনীতির মূল ভিত্তিই হলো বিভিন্ন রোগাক্রান্ত হওয়ার আগেই ‘প্রতিরোধের ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া’। তবে আধুনিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামোর বহুমাত্রিক উন্নয়ন সাধিত হলেও ভেজাল খাদ্য ও দুর্নীতি—এই দুটি বিষয়ই জনস্বাস্থ্যের অগ্রগতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রধান অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি অত্যন্ত যুক্তি দিয়ে জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে আধুনিক ডায়ালিসিস মেশিন বা বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করা হলেও যদি খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানো পুরোপুরি বন্ধ করা না যায়, তবে কিডনিসহ নানাবিধ ক্রনিক ও জটিল রোগের রোগীর সংখ্যা সমাজজুড়ে কেবল বাড়তেই থাকবে। এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি রোধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি সংস্থাকে আরও বেশি জোরালো ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের বড় অঙ্কের বরাদ্দ ও দুর্নীতির কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার সরকারি টেন্ডার আহ্বান করা হবে। বর্তমান সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিকে বিন্দুমাত্র বরদাস্ত করবেন না উল্লেখ করে তিনি দৃঢ়তার সাথে আশ্বস্ত করেন যে, যত প্রভাবশালী বা শক্তিশালী ব্যক্তিই হোক না কেন, দুর্নীতির সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিগত বছরগুলোতে লবণ উৎপাদনে আয়োডিনের ঘাটতি দূর করার অভাবনীয় কার্যকারিতাকে বিশেষ সাধুবাদ জানিয়ে ডা. এম এ মুহিত বলেন, অতীতের ধারাবাহিক সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে আয়োডিনযুক্ত লবণ আজ দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সহজে পৌঁছে যাওয়ায় অতীতে ঘটে চলা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীতার হার অনেকটাই সফলভাবে রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের সর্বনিন্ম সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, দেশের এখনও প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে আয়োডিনবিহীন লবণ খাচ্ছেন। সমাজের এই আটজনের মধ্যে একজন মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট করে গভীর গবেষণার মাধ্যমে তাদের প্রতিটি পরিবারের কাছে শতভাগ আয়োডিনযুক্ত লবণ পৌঁছে দেওয়ার ওপর তিনি সর্বোচ্চ জোর দেন। এছাড়া দেশের বিশেষ করে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগে থাকা শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের যেকোনো মূল্যে মূলধারার পুষ্টি ও চিকিৎসাসেবা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে সংশ্লিষ্ট সকল সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অধিকতর নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উক্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতি ছিলেন—শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত সচিব জাকের হোসেন খান, গেইনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. রুদাবা খন্দকার, নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাভালের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. এ, কে, এম, মুসা এবং বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সম্মানিত সভাপতি নুরুল কবির। এর পাশাপাশি পুরো অনুষ্ঠানটিতে অত্যন্ত সফলভাবে সভাপতিত্ব করেন বিসিকের সম্মানিত চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ।


























