বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যবর্তী দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও গভীর সুসম্পর্ককে ‘অর্থনৈতিক অগ্রগতি, নতুন সম্ভাবনার উন্মেষ এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে’ রূপান্তর করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে অবস্থিত জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় ‘কানতেই’-তে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে তিনি এই প্রত্যাশার কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “উৎপাদনশীল খাতসমূহে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক লাভজনক বৈশ্বিক ব্যবসায়িক উদ্যোগ জোরদার করার মাধ্যমে দুই দেশের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আমরা জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
তিনি আরও যোগ করে বলেন, “আমরা দুই দেশ একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে আমাদের দুই মহান জাতির জন্য আরও বেশি সহনশীল ও সুদৃঢ় সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে পারব। আমাদের মূল লক্ষ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট—দুই দেশের এই অমলিন বন্ধুত্বকে সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং যৌথ সমৃদ্ধির সুদৃঢ় চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত করা।”
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, “আসুন, আমরা সকলে মিলে এমন একটি টেকসই অংশীদারত্ব গড়ে তুলি, যা আজ আমাদের দেশের সাধারণ জনগণের কল্যাণে প্রত্যক্ষ কাজ করবে এবং আগামী দিনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি চিরস্থায়ী সুদৃঢ় উত্তরাধিকার রেখে যেতে সক্ষম হবে।”
এর আগে আজ সকাল পৌনে ১২টায় কানতেই ভবনে দুই দেশের সম্মানিত প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নেতৃত্বে এক দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের পরপরই দুই প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত দেশি-প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই জাপানি ভাষার ঐতিহ্যবাহী অভিবাদন ‘কোন্নিচিওয়া’ (শুভদিন) উচ্চারণের মাধ্যমে শুভসূচনা করেন।
জাপানি প্রধানমন্ত্রীর চমৎকার ও আন্তরিক আতিথেয়তায় গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, ‘‘এই উষ্ণ রাজকীয় অভ্যর্থনা ও অত্যন্ত আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য আমি সমগ্র বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে মান্যবর প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং জাপানের মহামান্য জনগণের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
জাপানের সাথে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সুসম্পর্কের নিবিড়তা ও গভীরতা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরের গভীরতম হৃদয়ে জাপানের জন্য এক অত্যন্ত বিশেষ স্থান চিরকাল সংরক্ষিত রয়েছে। পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং বৈশ্বিক শান্তি, যৌথ সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অভিন্ন সুনির্দিষ্ট ভিত্তির ওপর আমাদের এই অমলিন বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত।”
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “শান্তিকামী দেশ হিসেবে জাপান ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রথম দিকেই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানকারী অন্যতম বন্ধুরাষ্ট্র। বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান ও নির্ভরযোগ্য প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে পাশে রয়েছে। বাংলাদেশের সার্বিক আর্থসামাজিক অগ্রগতি ও মেগা অবকাঠামোগত কাঠামোগত উন্নয়নে জাপানের অসামান্য প্রাতিষ্ঠানিক অবদান রয়েছে। এই কালজয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের জন্য আমরা অত্যন্ত গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।”
শীর্ষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আয়োজিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি এবং আমি দুই দেশের কৌশলগত দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক আলোচনা সম্পন্ন করেছি।”
তিনি আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, “আমাদের দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক পুনরায় স্মরণ করে আমরা সার্বিক জ্বালানি খাত, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), আধুনিক রেলপথ ও ভারী অবকাঠামো নির্মাণ, গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন এবং প্রত্যক্ষ বৈশ্বিক বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বহুলাংশে সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বকে আরও বেশি শক্তিশালী করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছি।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, “আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও গভীর রূপ দিতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর ও বিনিময় করা হয়েছে। আমাদের এই দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ আলোচনার ইতিবাচক ফলাফল ও যৌথ অগ্রাধিকারসমূহ পরবর্তীতে প্রচারিত আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতিতে বিশদভাবে তুলে ধরা হবে।”
একই সাথে জাপানের শীর্ষ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বিশেষ আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “বাংলাদেশ ও জাপানের এই অবিচ্ছেদ্য অংশীদারত্ব মূলত কয়েক দশকের গভীর বন্ধুত্ব, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আজ সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে অনন্য এক উচ্চতায় উন্নীত করার এক মহৎ সুযোগ আমাদের সামনে হাতছানি দিচ্ছে।”
বক্তব্যের ইতি টানার পূর্বে তিনি অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে বলেন, “আমি জাপানের খ্যাতনামা বিনিয়োগকারী, শিল্পো উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী সমাজ এবং শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান চমৎকার ও নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো সরেজমিনে অনুসন্ধান করার এবং আমাদের প্রগতির আগামী দিনের পরবর্তী অধ্যায়ের অংশীদার হওয়ার জন্য বিনীত ও আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি।”
সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী মুহূর্তে জাপানি ভাষায় বিনম্র শ্রদ্ধা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আরিগাতো গোজাইমাস’ (আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ)।






















