মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বসবাস করে আসা প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় বিশেষ পাসপোর্ট প্রদান করার বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ইতোমধ্যেই সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৪ হাজার ৩০০ জন আবেদনকারীর হাতে এসব বিশেষ পাসপোর্ট সফলভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের মাঝেও এসব বিশেষ ভ্রমণ নথি বিতরণের যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলতি বছরের ডিসেম্বরের ভেতরেই চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক সহযোগিতায় বিশেষ এই পাসপোর্ট প্রদান করার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে এই কর্মসূচির সার্বিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অনুবিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, রোহিঙ্গাদের প্রদান করা বিশেষ এই পাসপোর্টসমূহ বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহৃত পাসপোর্ট থেকে একেবারেই ভিন্ন। কেবল তাদের সুনির্দিষ্ট ও আলাদা পরিচয় নিশ্চিত করার জন্যই এই বিশেষ নথি ইস্যু করা হচ্ছে। ফলে এই নথির অজুহাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনোভাবেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দাবি করার আইনি সুযোগ পাবেন না, কিংবা বাংলাদেশে ভ্রমণের মাধ্যমে প্রবেশের কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার ভোগ করবেন না। ঠিক একইভাবে, এই নথির ওপর ভিত্তি করে তারা সৌদি আরবের নাগরিকত্ব পাওয়ারও কোনো সুযোগ পাবেন না।
প্রাসঙ্গিক তথ্য ও ইতিহাস পর্যালোচনা করে সূত্রের খবরে জানানো হয়, অতীতে বিভিন্ন সময়ে অবৈধ কিংবা ভুয়া উপায়ে বাংলাদেশের জাতীয় পাসপোর্ট হাসিল করে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সেই সব পাসপোর্টের নির্দিষ্ট মেয়াদ পার হলে মেয়াদ উত্তীর্ণ পাসপোর্টগুলো দ্রুত নবায়নের জন্য সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকাকে দফায় দফায় চাপ ও তাগিদ দেওয়া হতে থাকে। বিষয়টির সাথে দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যকার সার্বিক কূটনৈতিক সুসম্পর্ক এবং সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি বিশাল শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ স্বার্থ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকায় বাংলাদেশ সরকার বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রাজধানী ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের মহামান্য রাষ্ট্রদূতের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রোহিঙ্গা পাসপোর্টের এই দ্বিপক্ষীয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনায় ওঠে আসে। এর পর থেকে মাঠপর্যায়ে কঠোর যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে রোহিঙ্গাদের এই বিশেষ পাসপোর্ট ইস্যু করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি এই বিশেষ পাসপোর্টে সম্পূর্ণ পৃথক এবং সুনির্দিষ্ট একটি সিরিয়াল নম্বর ব্যবহারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতের সব আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশের আধুনিক বায়োমেট্রিক তথ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যুক্ত রাখা হয়েছে। মূলত এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় সহজেই নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশের প্রকৃত মূল নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেকোনো ধরণের জালিয়াতি বা অপব্যবহার শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।























