আগামী ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দিবসটিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী দলীয় উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে।
আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন উপলক্ষে দলের এক গুরুত্বপূর্ণ যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আনুষ্ঠানিকভাবে এসব কর্মসূচির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
যৌথসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানানো হয়, আগামী ৭ নভেম্বর দেশব্যাপী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বর্ণাঢ্য র্যালি করবে বিএনপি। এদিন সকাল ঠিক ৬টায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। এরপর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বেলা ১১টায় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পবিত্র মাজার জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
এছাড়াও দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে বিশেষ আলোচনা সভা, আকর্ষণীয় পোস্টার প্রকাশ, তরুণ প্রজন্মের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং ঐতিহাসিক চিত্র প্রদর্শনীর মতো নানাবিধ জনমুখী আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হলো ৭ নভেম্বর। এই দিনের মূল অন্তর্নিহিত চেতনা হলো দেশের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ মানুষের গণতন্ত্র রক্ষার অদম্য চেতনা। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগের সময়ে দেশের অভ্যন্তরে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের জনগণের মাঝে এক গভীর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। আর ঠিক সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ৭ নভেম্বরের সেই মহান বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল।”
রিজভী আরও উল্লেখ করেন, “৭ নভেম্বরের অভূতপূর্ব পরিবর্তনের পরপরই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার মূল কেন্দ্রে অবতীর্ণ হন।” ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “জাতির ওই ঘোর সংকটময় মুহূর্তে জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে পুরো জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন।”
বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনার পর দেশবাসী হারিয়ে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র, নিজ মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের হারানো স্বাধীনতা ফিরে পায়। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাত্র চারটি সরকারি সংবাদপত্র বহাল রেখে বাকি সব সংবাদপত্র চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে সেই সময় বিপুল সংখ্যক সংবাদকর্মী বেকার হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে ৭ নভেম্বরের পর সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় পরিচালনা করার অবাধ সুযোগ লাভ করে।”
দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অতীতে বিভিন্ন সময়ে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলের তীব্র সমালোচনা করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওই ফ্যাসিস্ট আমলেও রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন ও শক্তি প্রয়োগ করে বিরোধী মতকে কঠোরভাবে দমনের অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে শত নির্যাতনের মুখেও এ দেশের সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, “ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের বিপ্লবী চেতনা আমাদের সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলনকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। দেশের সাহসী ছাত্রসমাজ, মেহনতি শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সেই গণআন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। এর ফলেই গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং দেশে সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রের পথ আবারও উন্মুক্ত হয়।”
তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতে যদি কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি পুনরায় এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর জোর করে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালায়, তবে ৭ নভেম্বরের অদম্য চেতনা এ দেশের মানুষকে আবারও একাট্টা হতে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করবে। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সব নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে এই দিনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য অপরিসীম।”
ঘোষিত কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি এবং দলটির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতেই এই কর্মসূচির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী ৭ নভেম্বর সকাল ৬টায় ঢাকা মহানগরসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর রাজধানী ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয়ভাবে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হবে। এছাড়া দেশব্যাপী সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও পৃথকভাবে র্যালি আয়োজনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাঠানো হবে।
নির্ধারিত দিনে বেলা ১১টায় জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং মরহুমদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ ফাতেহা পাঠ করবেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনগুলোর উদ্যোগে বিশেষ পোস্টার প্রকাশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। এর পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সার্বিক উদ্যোগে তরুণদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও বিশেষ চিত্র প্রদর্শনীর অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে।
আলোচনা সভার তারিখ প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী জানান, সম্ভাব্য আগামী ৬ নভেম্বর আলোচনা সভার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যানের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়া গেলে নির্ধারিত ওই দিনই আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হবে। অন্যথায় চেয়ারম্যানের নির্ধারিত অন্য কোনো সুবিধাজনক তারিখে এই সভার আয়োজন করা হবে বলে তিনি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন।






















