ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক চরম নাটকীয়তার পর ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। প্রথম ধাপের নির্বাচনে পিছিয়ে থাকার বড় ধাক্কা কাটিয়ে রান-অফ বা দ্বিতীয় ধাপের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ে তিনি তাঁর কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্ল্যাভিও বোলসোনারোকে পরাজিত করেছেন। ১৯৮৮ সালে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠার পর এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে প্রথম ধাপে পিছিয়ে থাকা কোনো প্রার্থী দ্বিতীয় ধাপে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
ব্রাজিলের সুপিরিয়র ইলেক্টরাল কোর্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯৮.৮৭ শতাংশ ভোট গণনার পর লুলা দ্য সিলভা ৫১.৭৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডানপন্থী প্রার্থী ফ্ল্যাভিও বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২১ শতাংশ ভোট। এর অর্থ হলো, লুলা ৪ মিলিয়নেরও বেশি ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেছেন। এই জয়ের ব্যবধান ২০২২ সালের নির্বাচনে ফ্ল্যাভিওর বাবা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর বিরুদ্ধে লুলার অর্জিত জয়ের ব্যবধানের চেয়েও অনেক বড়।
নির্বাচনী জয়ের পর সাও পাওলোতে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার সময় আবেগঘন কণ্ঠে লুলা বলেন, ‘গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য ব্রাজিলবাসীকে ধন্যবাদ’। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ফলাফলের মাধ্যমে বিশ্ববাসী স্পষ্ট বার্তা পেয়েছে যে, ‘ব্রাজিল কারো পেছনের উঠোন হয়ে থাকবে না’। চতুর্থ মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটিই তাঁর জীবনের সেরা মেয়াদ হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন এবং তরুণ, নারী ও শিক্ষকদের এই অভাবনীয় জয়ে বিশেষ অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানান। নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে কংগ্রেসে পাস হওয়া বেতন না কেটে সপ্তাহে দুই দিন ছুটির সাংবিধানিক আইনটি শ্রমিকদের সমর্থন পেতে লুলাকে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছিল।
অন্যদিকে, পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করে ৪৫ বছর বয়সী সিনেটর ফ্ল্যাভিও বোলসোনারো ফলাফলকে ‘অব্যাখ্যাযোগ্য’ ও ‘অসম্ভব’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি নির্বাচন বাতিলেরও জোর দাবি জানিয়েছেন। তবে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের সভাপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছেন এবং বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনী ফলাফল বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। উল্লেখ্য, ফ্ল্যাভিওর পিতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করার দায়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গৃহবন্দী রয়েছেন।
ভোটের দিনটি অবশ্য কিছুটা বিতর্ক ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা ছিল। সাউ পাওলো ও সালভাদরে যাত্রীবাহী বাস সংকটের কারণে ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে সমস্যা হওয়ায় লুলার দল ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে। অন্যদিকে, দক্ষিণ অঞ্চলে প্রচণ্ড খারাপ আবহাওয়ার অজুহাতে ভোটের সময় বাড়ানোর আবেদন করে ফ্ল্যাভিওর শিবির। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে সারা দেশে ২ ঘণ্টা বাড়ানো হয় ভোটের সময়সূচি। তবে রেকর্ড পরিমাণ ভোটার উপস্থিতি এই নির্বাচনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল।
এই জয়ের মাধ্যমে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রবীণ নেতা লুলা দ্য সিলভা ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় থাকবেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ এবং পরবর্তীকালে ২০২৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা লুলা ব্রাজিলের ইতিহাসে একমাত্র নেতা যিনি চারটি মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার নজির গড়লেন।























