Dhaka ০৪:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত, শ্রমিকদের বেতন জানুয়ারি থেকে কার্যকর বড়দিন উদযাপনে খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্রাস্টকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী কারখানা বন্ধের চক্রান্ত ও উসকানিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাকশিল্পে টানা অস্থিতিশীলতায় চরম উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত: বিশ্বব্যাংক ভ্যাটসহ প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দাঁড়াল ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকের এমডিদের সতর্ক করলেন গভর্নর উদ্যোক্তাদের অনীহায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে চার মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনা নয়, অনিবার্য বাস্তবতা: প্রধানমন্ত্রী

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ

  • সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:১৫:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৭ বার দেখা হয়েছে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রকাশিত অত্যন্ত সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী ও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। বিশাল অর্থনৈতিক শক্তির দেশ এবং বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতকে মাথাপিছু জিডিপির নিরিখে পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত পথে রয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের সামগ্রিক জনসংখ্যার বিশাল ব্যবধান এবং সার্বিক অর্থনীতির মোট আয়তনের দিক থেকে ভারত বহু গুণে বড় হওয়া সত্ত্বেও, মাথাপিছু আয়ের এই খতিয়ানে প্রতিবেশী দেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই ঐতিহাসিক অর্জন ইতিমধ্যে বিশ্ববাসীর বিশেষ নজর কেড়েছে।

আইএমএফের সর্বেমেষ প্রাক্কলন ও পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু গড় আয় বা জিডিপি আনুমানিক ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এর বিপরীতে বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারতের ক্ষেত্রে এই নির্ধারিত অঙ্কটি থাকবে প্রায় ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। বিগত দুই দশকের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে মূল অনুঘটক বা চালিকাশক্তি হিসেবে অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ করেছে দেশের প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী ভাইবোনদের অক্লান্ত পরিশ্রমে পাঠানো বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং কর্মসংস্থানের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান ও অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

তবে এই অভূতপূর্ব সাফল্যের মুদ্রার অপর পিঠেও লুকিয়ে রয়েছে বেশ কিছু কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির সার্বিক সূচকে ভারত চলতি বছর শক্তভাবে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশাবাদ ব্যক্ত করলেও, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী চাপে বাংলাদেশের মোট প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশের ঘরে। এছাড়া সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার বিচারে ভারত এখনো বেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় বাজারদর এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সামগ্রিক খরচ বিবেচনা করলে ভারতের সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার আর্থিক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশের মতো উচ্চ মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে রীতিমতো কঠিন করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০২৯ সালের কাছাকাছি সময়ে ভারত মাথাপিছু আয়ের এই পরিসংখ্যানে পুনরায় এগিয়ে যেতে পারে।

উভয় প্রতিবেশী দেশের জাতীয় অর্থনীতির কাঠামোগত বিন্যাসেও রয়েছে বড় ধরনের আকাশচুম্বী তফাত। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো মূলত এককভাবে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাত। এর বিপরীতে ভারত অনেক বেশি বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় এক অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে উন্নত প্রযুক্তি, সুবিশাল সেবা খাত এবং বিশাল এক অভ্যন্তরীণ বাজার ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক শক্তির জোগান দিয়ে চলেছে। বর্তমানের জটিল বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথসমূহ বন্ধ থাকায় দেশের জ্বালানি তেল এবং এলএনজি আমদানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করায় এবং দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান চালানগুলোও এই একই সামুদ্রিক পথেই প্রেরিত হওয়ায় পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন করে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, মাথাপিছু জিডিপির এই ধরনের পরিসংখ্যান মূলত একটি গড়ের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়ে থাকে, যা সমাজের ভেতরের আসল আয়বৈষম্য এবং ধনী-দরিদ্রের গভীর ব্যবধানকে প্রায়শই আড়াল বা ঢেকে রাখে। বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশেই দৃশ্যমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও তার সুফল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি; বরং মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালী মানুষের হাতেই বিপুল পরিমাণ সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। তাই আইএমএফের এই পরিসংখ্যান যেমন দেশের জন্য দারুণ এক সফলতার বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃত স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে অতি দ্রুত মূল্যস্ফীতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনার এক জোরদার তাগিদও দেয়।

জনপ্রিয়

মোংলা বন্দরে দুটি আধুনিক কন্টেইনার জেটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ

সর্বশেষ হালনাগাদ : ১০:১৫:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রকাশিত অত্যন্ত সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী ও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। বিশাল অর্থনৈতিক শক্তির দেশ এবং বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতকে মাথাপিছু জিডিপির নিরিখে পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত পথে রয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের সামগ্রিক জনসংখ্যার বিশাল ব্যবধান এবং সার্বিক অর্থনীতির মোট আয়তনের দিক থেকে ভারত বহু গুণে বড় হওয়া সত্ত্বেও, মাথাপিছু আয়ের এই খতিয়ানে প্রতিবেশী দেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই ঐতিহাসিক অর্জন ইতিমধ্যে বিশ্ববাসীর বিশেষ নজর কেড়েছে।

আইএমএফের সর্বেমেষ প্রাক্কলন ও পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু গড় আয় বা জিডিপি আনুমানিক ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এর বিপরীতে বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারতের ক্ষেত্রে এই নির্ধারিত অঙ্কটি থাকবে প্রায় ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। বিগত দুই দশকের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে মূল অনুঘটক বা চালিকাশক্তি হিসেবে অত্যন্ত জোরালোভাবে কাজ করেছে দেশের প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী ভাইবোনদের অক্লান্ত পরিশ্রমে পাঠানো বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং কর্মসংস্থানের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান ও অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

তবে এই অভূতপূর্ব সাফল্যের মুদ্রার অপর পিঠেও লুকিয়ে রয়েছে বেশ কিছু কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির সার্বিক সূচকে ভারত চলতি বছর শক্তভাবে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশাবাদ ব্যক্ত করলেও, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী চাপে বাংলাদেশের মোট প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশের ঘরে। এছাড়া সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার বিচারে ভারত এখনো বেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় বাজারদর এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সামগ্রিক খরচ বিবেচনা করলে ভারতের সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার আর্থিক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশের মতো উচ্চ মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে রীতিমতো কঠিন করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০২৯ সালের কাছাকাছি সময়ে ভারত মাথাপিছু আয়ের এই পরিসংখ্যানে পুনরায় এগিয়ে যেতে পারে।

উভয় প্রতিবেশী দেশের জাতীয় অর্থনীতির কাঠামোগত বিন্যাসেও রয়েছে বড় ধরনের আকাশচুম্বী তফাত। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো মূলত এককভাবে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাত। এর বিপরীতে ভারত অনেক বেশি বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় এক অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে উন্নত প্রযুক্তি, সুবিশাল সেবা খাত এবং বিশাল এক অভ্যন্তরীণ বাজার ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক শক্তির জোগান দিয়ে চলেছে। বর্তমানের জটিল বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথসমূহ বন্ধ থাকায় দেশের জ্বালানি তেল এবং এলএনজি আমদানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করায় এবং দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান চালানগুলোও এই একই সামুদ্রিক পথেই প্রেরিত হওয়ায় পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন করে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, মাথাপিছু জিডিপির এই ধরনের পরিসংখ্যান মূলত একটি গড়ের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়ে থাকে, যা সমাজের ভেতরের আসল আয়বৈষম্য এবং ধনী-দরিদ্রের গভীর ব্যবধানকে প্রায়শই আড়াল বা ঢেকে রাখে। বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশেই দৃশ্যমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও তার সুফল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি; বরং মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালী মানুষের হাতেই বিপুল পরিমাণ সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে। তাই আইএমএফের এই পরিসংখ্যান যেমন দেশের জন্য দারুণ এক সফলতার বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃত স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে অতি দ্রুত মূল্যস্ফীতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনার এক জোরদার তাগিদও দেয়।