ঐতিহাসিক ও ব্যস্ততম ঢাকা শহরকে সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন, রোগজীবাণুমুক্ত, স্বাস্থ্যকর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃত বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরম আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালনের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি আবেগঘণ কণ্ঠে বলেন, “অন্য সবার কথা আপাতত বাদ দিন, কেবল নিজের প্রাণের সন্তানের জন্য হলেও একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বাসযোগ্য শহর আমরা গড়ে তুলি। আসুন, আমরা সবাই মিলে একসাথে সেই পবিত্র চেষ্টা করি।”
আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকার গুলিস্তানে অবস্থিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান কার্যালয় ‘নগর ভবন’ সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সেখানে আয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এই উদাত্ত আহ্বান জানান।
কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, পৃথিবীর কোনো সচেতন বাবা-মা নিশ্চয়ই চাইবেন না যে তাঁর নিজের সন্তান কোনো নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত, রোগজীবাণুতে ভরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠুক। কারণ একজন সন্তান কেবল নিজ বাড়ির চারদেওয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দৈনন্দিন শিক্ষা, খেলাধুলা ও বিনোদনের তাগিদেই তাকে স্কুল, কলেজ, পার্ক ও খেলার মাঠসহ পুরো শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে হয়। ফলে শুধু নিজ বাসাবাড়ির আঙিনা নয়, বরং পুরো রাজধানী শহরকেই সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, “আপনার প্রিয় সন্তানটি তো আর কেবল আপনার নির্দিষ্ট এলাকার সীমানায় আটকে থাকবে না। সে তো শিক্ষা ও প্রাত্যহিক প্রয়োজনে পুরো ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াবে। কাজেই আসুন, আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাই মিলে সেই চেষ্টাটুকু করি। আমরা সত্যিকারে চেষ্টা করলে এই কঠিন কাজ অবশ্যই সফলভাবে করতে পারব।”
মেগাসিটি ঢাকার অন্যতম প্রধান ও পুরনো সমস্যা আবর্জনা তৈরি ও অপরিচ্ছন্নতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, সুদীর্ঘকালের এই পুঞ্জীভূত সমস্যা হুট করে এক দিনে কিংবা সাত দিনে রাতারাতি সমাধান করা হয়তো সম্ভব নয়। তবে সমাজ ও প্রশাসনের সর্বস্তরের মানুষ যদি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যায়, তবে ক্রমান্বয়ে পুরো ঢাকা শহরের দৃশ্যপট বদলে যাবে।
নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ—যেকোনোভাবেই হোক না কেন, এই বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের সাথে সরাসরি জড়িত। পুরোপুরি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে হয়তো খানিকটা সময় লাগবে, কিন্তু নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেলে সুফল আসবেই। আপনাদের নিজেদের মনের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মানসিকতা লালন করতে হবে। কারণ যেকোনো বড় পরিবর্তনের পেছনে আসল শক্তি হলো নিজের অদম্য ইচ্ছা।”
প্রশাসনিক তদারকি জোরদারের তাগিদ দিয়ে সরকারপ্রধান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি নিজের উদাহরণ টেনে বলেন, “আমি যখন রাজধানীর যে প্রান্তেই যাতায়াত করি, তখন চারপাশে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকি যে কোথায় কী ধরনের নাগরিক সমস্যা রয়েছে। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ফোন করে দিকনির্দেশনা দিই। আপনারাও যদি মাঠপর্যায়ে একইভাবে সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখেন এবং তা দ্রুত নিরসনে কার্যকরী পদক্ষেপ নেন, তবে পরিবর্তন হতে বাধ্য।”
রাজধানীর সার্বিক পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতির কিছুটা হলেও ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ কোরিয়ার একটি খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার সাথে নিজের সাম্প্রতিক এক চিত্তাকর্ষক কথোপকথনের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাণিজ্য পরিচালনা করা দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বহুজাতিক কোম্পানির কর্ণধার সম্প্রতি তাঁর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁর কাছে ঢাকার সাম্প্রতিক পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে ওই বিদেশি ব্যবসায়ী জানান যে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্নতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কিছুটা ভালো মনে হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “লক্ষ্য করুন, তিনি কিন্তু বানিয়ে বলেননি যে অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়ে গেছে। তিনি বস্তুনিষ্ঠভাবে বলেছেন, আগের চেয়ে ‘কিছুটা ভালো’ হয়েছে। এর সোজা অর্থ হলো—পরিবর্তন আনা মোটেও অসম্ভব নয়। আমরা সবাই যদি একযোগে সততার সাথে চেষ্টা করি, তবে এই শহরকে আরও অনেক চমৎকার ও উন্নত করা যাবে।”
পরিশেষে প্রশাসনিক আত্মসমালোচনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নাগরিক হিসেবে আপনারা সরকারের কিংবা আমার সমালোচনা করতেই পারেন, সে স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে নিজের ভেতরের বিবেকের কাছেও নিজের কাজের সঠিক মূল্যায়ন ও সমালোচনা করা উচিত। নিজ নিজ মনকে প্রশ্ন করা দরকার যে, অর্পিত সরকারি দায়িত্ব আমি কতটুকু সঠিকভাবে পালন করছি এবং দেশের জন্য কতটুকু আন্তরিক চেষ্টা চালাচ্ছি।”






















